সঠিক কাজ যথাসময়ে

সঠিক কাজ যথাসময়ে…মামুন রশীদ

আমার এক বন্ধু তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক। চারপাশের অনেক ঘটনা তাকে বিস্মিত করে। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে গেলে তার সফরসঙ্গী কতজন, সে প্রসঙ্গ তিনি তোলেন। এদের পেছনে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে। কারা এ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন? উত্তর জানা_ রফতানিকারক ও প্রবাসে কর্মরত বাংলাদেশি। তার আরও প্রশ্ন_ পোশাকশিল্পে নতুন কেউ যোগ দিলে তার জন্য নূ্যনতম ৩৬০০ টাকা মাসিক বেতনের প্রস্তাব করেছেন শিল্প মালিকরা এবং তাদের সংগঠন বিজিএমইএ। এখন নানা শিল্প এলাকায় তার প্রতিবাদ চলছে। কেউ কেউ ভাংচুর শুরু করেছে। জ্বলছে রাজপথে চলা যানবাহন। উৎপাদনের ক্ষতি হচ্ছে। বিদেশের অনেক আমদানিকারক উদ্বিগ্ন_ বাংলাদেশ থেকে সময়মতো পোশাকের সরবরাহ মিলবে তো? এখানে অস্থিরতা চলতে থাকলে তারা বিকল্প উৎপাদক দেশের সন্ধান করবে, এটাই স্বাভাবিক।
বিজিএমইএ সভাপতি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিউইয়র্ক গেছেন। শিল্পে যখন চরম অস্থিরতা চলছে, তখন কেন তিনি দেশের বাইরে থাকবেন, এটাও আমার ওই বন্ধুর প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, জাতিসংঘের বার্ষিক অধিবেশনে সরকার প্রধানের সফরসঙ্গী হওয়া অনেকটা প্লেজার ট্রিপে যাওয়ার মতো। যে সংগঠনের তিনি নেতা, তার জন্য এটা তেমন ফলদায়ক নয়।
১৯৯৪ সালে তৈরি পোশাকশিল্পের নূ্যনতম মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা এবং এটা নির্ধারণ করেছিল মজুরি বোর্ড। ১২ বছর পর ২০০৬ সালে এটা বাড়িয়ে করা হয় ১৬৬২ টাকা। ২০১০ সালে নূ্যনতম মজুরি ঠিক হয় ৩ হাজার টাকা। এখন আবার নতুন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি আলোচনায়। শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠন দাবি করছে, নূ্যনতম বেতন হতে হবে ৮১১৪ টাকা (১০৬ মার্কিন ডলার)। অন্যদিকে মালিকরা বলছেন, তারা ৩৬০০ টাকা পর্যন্ত বিবেচনা করবেন। তবে কানাঘুষা রয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত নূ্যনতম মজুরি সাড়ে চার হাজার টাকার মতো হতে পারে। আমাদের সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের এ পর্যন্ত যে কাজের ধারা তাতে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে মাঝামাঝি একটা রফার জন্য চেষ্টা চলবে বলেই ধারণা। তবে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রার ব্যয় যদি আমরা বিবেচনায় নিই, তাহলে মাসে নূ্যনতম বেতন হওয়া উচিত ৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। ২০১০ সালে নূ্যনতম বেতন নির্ধারিত হয় তিন হাজার টাকা। গত তিন বছরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে যেসব গবেষণা পরিচালিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, নূ্যনতম মজুরি ৪২০০ টাকার কিছু বেশি নির্ধারিত হলে মোটামুটি ভারসাম্য থাকে।
মার্কেটিং কিংবা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম মূল্য নির্ধারণ সর্বদাই বড় চ্যালেঞ্জ। ‘লো প্রাইসিং’ উৎপাদনশীলতার ওপর যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি তা উৎপাদিত পণ্যের গ্রহণযোগ্যতার সমস্যাও সৃষ্টি করে। এমন কোনো মজুরিও নির্ধারণ করা চলে না, যা টেকসই হবে না কিংবা এই শিল্পের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা অসম্ভব করে তোলে। তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের অবশ্যই ন্যায্য মজুরি পেতে হবে। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধান ও হিসাব-নিকাশে দেখা যায়, মাসে নূ্যনতম ৬৫ ডলারের বেশি মজুরি প্রদান করা হলে তা এই শিল্পের বর্তমান পর্যায়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে না। দেশে বর্তমানে সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো নিট এবং ওভেন কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ২৭শ’রও কম কারখানা সরাসরি অর্ডার পেয়ে থাকে। অন্যরা কাজ করে সাব-কন্ট্রাক্টে। শ্রমিকদের নূ্যনতম মজুরি বেশি ধার্য করা হলে তাদের জন্য বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাজরীন ফ্যাক্টরিতে অগি্নকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসের ঘটনা এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জন্যই ওয়েক আপ কলের মতো। উন্নয়ন অংশীদার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নানাভাবে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একটা বিষয়ে সবাই একমত, যেভাবে চলছে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংগঠনগুলো কিংবা এমনকি উন্নত দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্বও পোশাকের ক্রেতাদের মধ্যে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পাদন করছেন। এটা শুভ উদ্যোগ। বাংলাদেশের শিল্প ইউনিটগুলোতে বিপর্যয় এড়ানোর জন্য আরও আগেই এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন ছিল।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, তাজরীন কিংবা রানা প্লাজার বিপর্যয়ের জন্য কেউই নূ্যনতম মজুরির হার কী হবে, সেটা সামনে আনেনি। এ ক্ষেত্রে বরং বিবেচনায় এসেছে_ কাজের পরিবেশ, শ্রম নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয় যথাযথভাবে অনুসরণ না করা। এটাও বলা হয়েছে যে, কারখানার ব্যবস্থাপনায় যেমন সুশাসনের অভাব, তেমনি সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোও কাজ করেনি। আমাদের অবশ্যই দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নূ্যনতম মজুরি হার পুনর্নির্ধারণ করা উচিত। কিন্তু মেশিনে কাজ করা শ্রমিকদের ওপর দুর্বল নির্মাণ কাঠামো কিংবা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে ভবনের ছাদ যেন আর ধসে না পড়ে, সেটা নিশ্চিত করা চাই সর্বাগ্রে। আর কোনো শ্রমিককেই কারখানায় অগি্নদগ্ধ হয়ে অঙ্গারে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। অগি্ননির্বাপক ব্যবস্থার অবশ্যই উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কারখানার ভেতরে কাজের পরিবেশ এমন হতে হবে, যাতে তা শ্রমিকের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে না ওঠে।
সংবাদপত্রের খবরে দেখেছি, প্রায় দুই হাজার তৈরি পোশাক কারখানা ‘সেফটি অডিটে’ পাস করবে না। এসব প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা দরকার। কারখানা পরিদর্শকরা অবশ্যই নূ্যনতম মান নিশ্চিত হয়েছে কিনা সে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। আমাদের ফায়ার সার্ভিসকে আরও আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সুসজ্জিত করতে হবে। যেসব এলাকায় পোশাকশিল্প গড়ে উঠেছে সেখানে অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যাপারেও চাই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি। একই সঙ্গে শ্রমিকদেরও কারখানায় অধিকতর শৃঙ্খলাবোধের পরিচয় দিতে হবে। চীনে এখন নূ্যনতম মজুরি মাসে ২০০ ডলারের বেশি। কিন্তু এটা সবাই জানে যে, সেখানে উৎপাদনশীলতার হার অনেক বেশি।
ভারতে তৈরি পোশাকশিল্পে মাসিক মজুরি ১১৩ ডলার, এমনটিই শুনেছি। পাকিস্তানে এর পরিমাণ ১১৮ এবং ভিয়েতনামে ১২০ ডলার। এটা কি নূ্যনতম মজুরি নাকি গড় মজুরি, সেটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। বাংলাদেশে পোশাকশিল্পে নূ্যনতম মজুরি ৪০ ডলার, কিন্তু তাদের গড় মজুরি ৫২০০ টাকা (৬৭ ডলার)। মজুরি হার নির্ধারণে উৎপাদনশীলতা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। তবে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে আরও অনেক বিষয় জড়িত_ যেমন, উপযুক্ত কারখানা ভবন, শ্রমমান নিশ্চিত করার ব্যবস্থা, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়, মূলধন ইত্যাদি।
আমাদের পোশাকশিল্পের যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে এবং সম্ভাবনাও প্রচুর। ইতিমধ্যেই এ শিল্পকে বলা হচ্ছে ২৩ বিলিয়ন ইন্ডাস্ট্রি এবং ২০১২ সালে তা ৫০ বিলিয়নে পেঁৗছাতে পারে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, উদ্যোক্তা, শ্রমিক, ক্রেতা, উন্নয়ন অংশীদার এবং সর্বোপরি সরকার_ সংশ্লিষ্ট সবার তরফে চাই আরও মনোযোগ। কোনো ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হতেই পারে, তবে আমাদের বেশি করে প্রয়োজন যথাসময়ে সঠিক কাজটি করে ফেলা।

কলাম লেখক