সড়ক উন্নয়নের ৬২ কোটি টাকা গেল কোথায়?

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী উড়ালসড়ক চালু অনেকটা নিশ্চিত হলেও সড়কের নিচের ও দুই পাশের রাস্তাঘাটের বেশির ভাগই সংস্কার হয়নি। বিশেষ করে ফুলবাড়িয়া থেকে গুলিস্তান হয়ে জয়কালী মন্দির, স্বামীবাগ, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, কুতুবখালী পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকার অর্ধেকেরও বেশি রাস্তা এখন পর্যন্ত বেহাল। এ ছাড়া উড়ালসড়কের নিচের রাস্তার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ সব স্থাপনা এবং রাস্তার দুই পাশে বসে যাওয়া বাজার রাস্তাকে সংকুচিত করে ফেলেছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প এলাকার রাস্তায় যানজট এখন আরও বেড়েছে।ঢাকা সিটি করপোরেশন ও উড়ালসড়ক প্রকল্প সূত্রমতে, ভগ্নদশার সড়ক সংস্কার না করে উড়ালসড়ক চালু হলে তাতে উঠতে ও নামতে প্রকৃত সুবিধা মিলবে না।এই উড়ালসড়কের নাম ‘মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার’। এই উড়ালসড়ক ব্যবহারের বিষয়ে ২০০৩ সালে টোলের যে হার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বহাল থাকছে। এখানে সব ধরনের হালকা যানের জন্য টোল দিতে হবে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। থ্রি হুইলারের জন্য পাঁচ টাকা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও উড়ালসড়ক প্রকল্প পরিচালক মো. আশিকুর রহমান প্রথম আলোকেবলেন, অবশেষে প্রায় ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়ক চালু করা সম্ভব হচ্ছে। এর জন্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা সেতুর তুলনায় ন্যূনতম টোল দিতে হবে। কিন্তু তার পরও যেসব যানবাহন উড়ালসড়কের নিচের রাস্তা ব্যবহার করেই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে, রাস্তার ভোগান্তি এড়াতে তাদেরও টোল দিয়ে উড়ালসড়ক ব্যবহার করতে বাধ্য হতে হবে, যা কারও কাম্য নয়।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, এই উড়ালসড়ক নির্মাণে সরকার ও সিটি করপোরেশনের কোনো টাকা খরচ করতে হয়নি। বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড এটি নির্মাণ করছে। এ জন্য এই উড়ালসড়ক ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি টোল দিতে হবে।

৬২ কোটি টাকা গেল কোথায়: সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেতু এলাকায় এসব রাস্তাঘাট উন্নয়নে গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে এ সময় পর্যন্ত প্রায় ৬২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে ১৫ কোটি টাকার কাজ করা হয় সিটি করপোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে। পরে করপোরেশনের নিজস্ব ও বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে কাজ করা হয়। অথচ বাস্তবে বেশির ভাগ রাস্তা, ফুটপাতের কাজ নিম্নমানের করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এমনকি উড়ালসড়ক এলাকার জয়কালী মন্দির ও আশপাশের এলাকার ফুটপাতের মান নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু রাস্তার উন্নয়নকাজ ধরাই হয়নি।

গত ২৩ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে ১৫ রমজানের মধ্যে (২৪ জুলাই) উড়ালসড়কের সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী এলাকার ড্রেনেজ ও সড়ক মেরামতের কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু ২৪ জুলাই তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত তা মেরামত হয়নি।

ফুলবাড়িয়া থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত রাস্তা ক্ষতবিক্ষত। গুলিস্তান চৌরাস্তার মোড় থেকে উড়ালসড়কের একদিকে কাপ্তানবাজার এবং অন্যদিকে বঙ্গভবনের পাশঘেঁষা দুটি সড়ক বৃষ্টির কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। উড়ালসড়কের মাঝখানের পথ পেরোতে গিয়ে রিকশা ও অটোরিকশা নিয়মিত উল্টে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি রিকশা উল্টে আরোহী মা ও ছেলে আহত হন।

যাত্রাবাড়ী থানার পাশে প্রধান সড়কটি সংস্কারের নামে মাঝেমধ্যে কিছু খোয়া ফেলা হয়। কাঁচপুরের দিক থেকে আসা বাস ও অন্য যানবাহন চলাচল করে এখানে হেলেদুলে। গ্রিন লাইন পরিবহনের যাত্রী আবদুস সোবহান ওই পথে চলার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে প্রশ্ন করেন, এত টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার তৈরি করছে, অথচ রাস্তার এমন হাল কেন?

জয়কালী মন্দির-যাত্রাবাড়ী এলাকায় প্রায় চার কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের কাজ চলছে। এখানে দুই, আড়াই ও তিন ফুটের পাইপলাইন বসানোর কথা। ঈদুল ফিতরের আগেই পুরো কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও রাস্তার উত্তর প্রান্তে কাজ শুরুই করা হয়নি। কাজ হয়েছে দক্ষিণ প্রান্তে শহীদ ফারুক সড়ক থেকে সায়েদাবাদ, স্বামীবাগ র‌্যাব কার্যালয় থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল পর্যন্ত। কিন্তু গতকাল গিয়ে দেখা যায়, এসব এলাকার রাস্তাগুলো আবার ভেঙে যাচ্ছে।

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, ঠিকাদারেরা যেসব রাস্তা মেরামত করেছেন, সেগুলোর বিল পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত প্রায় ৬২ কোটি টাকার বিল দিলেও মাত্র ২২ কোটি টাকা পরিশোধ করা সম্ভব হয়েছে। ঠিকাদারদের অনুরোধ করে কাজ করাতে হচ্ছে।

৬২ কোটি টাকার বিল জমা হলেও রাস্তার এ অবস্থা কেন—এ প্রশ্নের জবাবে মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উড়ালসড়কের কাজের জন্যও মেরামত করা রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নতুন মেরামতের কাজে সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া, বৃষ্টিতে অনেক রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার পরও উড়ালসড়ক চালুর আগেই নিচের রাস্তাঘাট মেরামতের কাজ শেষ করার জোর চেষ্টা চলছে।

তবে অপর একটি সূত্র জানায়, গণক্রয় বিধিমালা (পিপিআর, ২০০৮) অনুযায়ী, কাজ চলা অবস্থায় বিল পরিশোধের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

প্রকল্প এলাকায় বাজার, অবৈধ স্থাপনা: একদিকে রাস্তা খারাপ; তার ওপর প্রকল্প এলাকার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে অবৈধ স্থাপনা। যাত্রাবাড়ী থানার বিপরীত দিকে রাস্তাজুড়ে বসা বাজার উচ্ছেদ করা হয়েছিল গত জুলাইয়ের শেষ দিকে। সেখানে আবার বাজার বসে গেছে। এভাবে কুতুবখালী, শনির আখড়া ছাড়িয়ে কাঁচপুর সেতু এলাকা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে তরিতরকারি, ফলমূলের সারি সারি দোকান বসেছে। পরিবহনমালিকদের দাবি, যানজটের অন্যতম কারণ রাস্তার দুই পাশের বাজার।

ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী এ বিষয়ে বলেন, একটি বাজার সকালে উচ্ছেদ করলে বিকেলে আবার বসে যাচ্ছে। পুরো এলাকায় একজন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত আছেন। তাঁর পক্ষে বারবার উচ্ছেদকাজ পরিচালনা সম্ভব নয়।

এদিকে যাত্রাবাড়ীসংলগ্ন কুতুবখালী ফাতেমা নাজ ফিলিং স্টেশনের সামনে তিনটি অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায়ও রাস্তার মধ্যে গড়ে উঠেছে দোকানপাট। এগুলো সেতুর নিচের রাস্তাকে সংকুচিত করেছে।

এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরকে দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হলেও প্রতিকার নেই। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে সওজকে চিঠি দেওয়া হয়।

জানতে চাইলে সওজের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল আলম বলেন, সওজের কিছু জায়গা সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার বাইরের জায়গা হলে দ্রুত অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হবে।