পরিবহন ধর্মঘট ডেকে দাবি আদায় নৌমন্ত্রীর

সড়ক দুর্ঘটনায় চালকের লঘু শাস্তিতে সম্মত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিচার নিয়ে নাগরিক সমাজের মুখোমুখি কর্মসূচি দিয়ে ব্যর্থ হলেও এবার চারদেয়ালের মাঝে বসে নিজের দাবি আপাতত আদায় করে নিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। তবে এর জন্য তাঁর নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট দিয়ে দরকষাকষিতে নামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে।

গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে এই ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খানও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে এখন থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ধারায় মামলা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই ধারায় হত্যার অভিযোগে বিচার করা হয়। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে দুর্ঘটনার যেসব মামলা ৩০২ ধারায় নেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হয়।

একই সঙ্গে লাইসেন্স নবায়নের শর্তও শিথিল করার পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত আদায় করে নেন শ্রমিকনেতারা।

এ সিদ্ধান্তের পর শ্রমিকনেতারা ২৩ সেপ্টেম্বর আহূত দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘট সাময়িক স্থগিত করেন।

শাজাহান খান প্রথম আলোকে বলেন, আজ (বৃহস্পতিবার) বৈঠকের কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্তের অগ্রগতি দেখে ধর্মঘট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

মানিকগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হওয়ার পর ৩০২ ধারায় মামলা নেওয়ার দাবি ওঠে।

নাগরিক সমাজসহ সব পক্ষের ওই আন্দোলনের বিপরীতে তখন নৌপরিবহনমন্ত্রীর নেতৃত্বে শ্রমিকেরা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ করেন।

‘স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই’ শিরোনামে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ঈদের দিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে ছাত্র-শিক্ষক পেশাজীবী জনতা। ওই আন্দোলন থেকে সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে বিদ্যমান আইন সংশোধন করে দায়ী চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং এ-সংক্রান্ত মামলাগুলো ফৌজদারি আইনে বিচারের দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া অবৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্তি বন্ধ করা, সড়ক ও পরিবহন খাতে দুর্নীতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, গণপরিবহন খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, চালকদের জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং সড়ক ও পরিবহনসহ প্রশাসনের সর্বস্তরে কার্যকর জবাবদিহির কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়।

নাগরিকদের ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা একটি ভয়াবহ সমস্যা। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন লোক দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছে। কঠোর শাস্তির বিধান থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাবধান হবেন। কিন্তু সরকারের একটি মহল যাঁদের পরিবহন ব্যবসা রয়েছে অথবা পরিবহনশ্রমিকদের নেতা, তাঁরা নিজেদের স্বার্থে ৩০২ ধারায় ফৌজদারি মামলার বিরোধিতা করছেন। গতকালের এই সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থবিরোধী বলে আখ্যা দেন তিনি।

বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, শ্রমিকনেতারা দাবি জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত মামলাগুলো আর ৩০২ ধারায় নেওয়া যাবে না। এমনকি ওই ধারায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলেছি, দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হত্যা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে হত্যার মামলা দায়ের করা যেতে পারে। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হত্যা করতে যায়। সে জন্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো হত্যার মামলা দায়ের করব না।’

কীভাবে এই মামলা প্রত্যাহার করা হবে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ৩০২ ধারায় যে পাঁচটি মামলা হয়েছে, তা তদন্ত কার্যক্রমে বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বিচারিক কার্যক্রমের পর্যায়ে ফৌজদারি কার্যবিধি ৪৯৪ ধারায় প্রত্যাহার করা হবে। এ ব্যাপারে শ্রমিকনেতাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এমন দাবি মেনে নিয়ে দুর্ঘটনাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের মামলাগুলো প্রথমে ৩০৪ ধারায় নেওয়া হবে।

জানতে চাইলে শাজাহান খান বলেন, ৩০২ ধারায় মামলা নেওয়া আইনসম্মত নয়। হত্যার উদ্দেশ্য না থাকলে এবং দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু হলে ৩০৪(খ) ধারায় মামলা হবে। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয়, উদ্দেশ্য নিয়ে মৃত্যু ঘটানো হয়েছে, তবে ৩০২ ধারায় মামলা নেওয়া হতে পারে।

৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, আর ৩০৪ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছরের কারাদণ্ড।

শ্রমিক ফেডারেশনের আরেকটি দাবি ছিল, পেশাদার চালকদের পুনরায় লাইসেন্স দিতে পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। কিন্তু মোটরযান আইন অনুযায়ী পাঁচ বছর পর লাইসেন্স নবায়ন করতে হলে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হবে চালককে। মিশুক মুনীর ও তারেক মাসুদ মারা যাওয়ার পর হাইকোর্টও পরীক্ষা নিয়ে নবায়নের পক্ষে আদেশ দেন। গত জুন মাস থেকে এই প্রক্রিয়ায় নবায়ন শুরুও হয়েছে।

কিন্তু গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রমিকনেতাদের চাপে ‘শুধু চোখ পরীক্ষা করে লাইসেন্স নবায়নের’ সিদ্ধান্তের কথা জানান।

জানতে চাইলে নিরাপদ সড়কের দাবিকে আন্দোলনকারী ইলিয়াস কাঞ্চন প্রথম আলোকে বলেন, যাঁরা এটা করছেন, দুর্ঘটনার দায় তাঁদেরও নিতে হবে। মামলা তাঁদের বিরুদ্ধেও যেন হয়, সে জন্য আন্দোলন করতে হবে।