সবার চোখ সংসদে

মসিউর রহমান খান
চলমান রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই আজ নবম জাতীয় সংসদের সম্ভাব্য শেষ অধিবেশন বসছে। এই অধিবেশনে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সংকট সমাধানের সুযোগ রয়েছে। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। তাই সবার প্রত্যাশা এ অধিবেশনেই বেরিয়ে আসবে সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান। রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির আশঙ্কায় জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থার পক্ষ থেকেও সমঝোতার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে সবার দৃষ্টি এখন সংসদের দিকে।
বিরোধী দল আজ সংসদে যাচ্ছে না। পরবর্তী সময়ে তারা সংসদ অধিবেশনে যাবে কি-না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল তার অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, বিরোধী দল গত অধিবেশনে অংশ নিয়েছে। তারা চলতি অধিবেশনেও অংশ নেবে বলে আমি আশাবাদী।
চলতি অধিবেশনে সংকট নিরসনের আশাবাদ ব্যক্ত করে প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে শুধু দেশে নয়, বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র ও বিদেশি দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরাও উদ্বিগ্ন। তাই সবার প্রত্যাশা এ অধিবেশনেই শান্তিপূর্ণ সমাধান আসবে। বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলামও একই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, সরকার ও বিরোধী দল সংসদে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান
খুঁজে পাবে_ এটাই সবার প্রত্যাশা।
সংবিধান অনুযায়ী ২৭ অক্টোবর থেকে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে সংসদ নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন ২৫ অক্টোবরের পর সংসদের অধিবেশন বসবে না। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিন আগের সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে বাধ্য বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুল মোবারক। তিনি বলেন, কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে, যেদিন ভাঙবে তারপর থেকে আরও ৯০ দিন সময় পাওয়া যাবে।
এদিকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ জানিয়েছেন, সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগ সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সংসদ বা সংসদের বাইরে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার কথা, বিএনপি এই অধিবেশনে প্রস্তাব বা রূপরেখা না দিলে সংসদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সরকারি দল অপেক্ষা করবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বুধবার সন্ধ্যায় সমকালকে জানান, সংসদে যোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে আমরা আশা করি দেশকে অনিবার্য সংঘাতের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল উত্থাপন করে পাস করবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের এমন সব হিসাব-নিকাশ আর জনমনে ব্যাপক প্রত্যাশ্যার মধ্যেই আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। বিকেল ৪টায় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে অধিবেশনের মেয়াদ নির্ধারণ করা হবে। রেওয়াজ অনুযায়ী অধিবেশন শুরুর পরপরই বরগুনা-২ আসনের এমপি গোলাম সবুর টুলুর মৃত্যুতে শোক প্রস্তাব গ্রহণের পর সংসদ মুলতবি হবে। অক্টোবরে ঈদুল আজহা ও দুর্গাপূজার কারণে এ অধিবেশনের মেয়াদ সংক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অধিবেশন এক সপ্তাহ চলার পর মুলতবি করা হতে পারে। ঈদের পর ২০ অক্টোবর থেকে মুলতবি অধিবেশন শুরু হতে পারে।
সংসদের চিফ হুইপ আবদুস শহীদ সমকালকে বলেন, এটাই শেষ অধিবেশন হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
নবম সংসদের ১৮টি অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিল ৩৯৪টি। বিরোধী দল উপস্থিত ছিল ৭৫ দিন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩২২ দিন সংসদে উপস্থিত ছিলেন। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ছিলেন ১০ দিন। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকারের পদ দেয়নি। তেমনি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বিরোধী দলে গেলেও সংসদ বর্জন না করার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। সংসদের যাত্রার শুরুর দিনে তারা অংশ নিলেও সামনের সারিতে আসন বণ্টনকে কেন্দ্র করে প্রথম অধিবেশনে টানা ১৭ দিন অনুপস্থিত ছিল। এরপরও তারা নানা ইস্যুতে সংসদ বর্জন অব্যাহত রাখে। বিগত বাজেট অধিবেশনে সংসদে যোগ দেয় বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল। এর মধ্যে সদস্যপদ রক্ষায় তারা কয়েকটি অধিবেশনে অংশ নিলেও বেশিরভাগ সময় ছিল বর্জনের মধ্যে। সদস্যদের অশ্লীল ও অসংসদীয় ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবম সংসদ অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
নবম সংসদে ২৩৪টি বিল পাস হয়েছে। এই অধিবেশনে ১৬টি বিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কমিটিতে বিবেচনাধীন রয়েছে ৮টি, পাসের অপেক্ষায় ৪টি, উত্থাপনের অপেক্ষায় ৮টি। অধিবেশনে ১৬টি সরকারি বিল ছাড়াও নতুন একটি বেসরকারি বিল পাস হতে পারে। অন্যদিকে কার্যদিবসে রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে চলতি সংসদ। মাত্র ৭ দিন অধিবেশন চললেই এ রেকর্ড সৃষ্টি হবে। এর আগে পঞ্চম সংসদে ৪০০ কার্যদিবস অধিবেশন চলেছে। বর্তমান সংসদ এ ক্ষেত্রে মাত্র ছয় দিন পিছিয়ে রয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৯৪ কার্যদিবস অধিবেশন চলেছে।
২০০৯ সালে অধিবেশন চলে ৮৬ কার্যদিবস। ২০১০ সালে ৮৮ কার্যদিবস। ২০১১ সালে অনুষ্ঠিত হয় ৮০ কার্যবিদস। ২০১২ সালে ৮৩ কার্যদিবস। চলতি বছরে অনুষ্ঠিত হয় ৫৭ কার্যদিবস। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পরে প্রথম পঞ্চম সংসদে ৪০০ কার্যদিবস অধিবেশন বসে। এ পর্যন্ত সেটাই ছিল সর্বোচ্চ। যদিও ওই সংসদ মেয়াদ পূরণের ১৩৩ দিন আগে ভেঙে গিয়েছিল। এরপর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনে গঠিত ষষ্ঠ সংসদে একটি অধিবেশনে মাত্র ৪ কার্যদিবস সংসদ বসেছিল। এরপর সপ্তম সংসদ পাঁচ বছরের পুরো মেয়াদ পূরণ করলেও অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ৩৮২। অষ্টম সংসদও তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করলেও অধিবেশনের কার্যদিবস ছিল ৩৭৩ দিন। সংসদ অধিবেশনের জন্য ইতিমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করেছে সংসদ সচিবালয়।