সময় খরচ সবই বাড়ে বাড়ে না কাজের গতি

প্রক্রিয়ার ফাঁদে আটকে আছে ৩১ হাজার কোটি টাকায় দেশের ২১টি মহাসড়ক সম্প্রসারণের মহাপরিকল্পনা। এর মধ্যে ২০টি মহাসড়ক চার লেন ও একটি মহাসড়ক আট লেনে উন্নয়নের প্রকল্প রয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে শুরু হয় সাতটি চার লেন ও একটি আট লেন মহাসড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প। এগুলো এখন শুধু ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণের চক্রে ঘুরছে। বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত জুনে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোনো কোনো প্রকল্পে অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। মহাজোট সরকারের অঙ্গীকারের বড় প্রকল্প ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৩৮ শতাংশ। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্পে অগ্রগতি ২৫ শতাংশ। নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা চার লেন প্রকল্পটিই শুধু এ সরকারের সময়ে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিলবোর্ড টানিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন প্রকল্প ‘শেষ পর্যায়ে রয়েছে’ বলে প্রচারণা চালানো হয়েছে। ব্যাপক সমালোচনার পর অবশ্য সেসব বিলবোর্ড সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ওই বিলবোর্ডের ছবি তুলে নিয়ে এখন তা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রদর্শন করা হচ্ছে।
সওজ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চার লেনে উন্নীত করার জন্য চিহ্নিত মহাসড়কগুলোর মধ্যে আছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা, গাজীপুর-আজমতপুর-ইটাখলা, টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড, ফরিদপুর-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক। এ ছাড়া চার লেন করার তালিকায় আছে ময়মনসিংহ-জামালপুর-শেরপুর, দৌলতদিয়া-মাগুরা-খুলনা, হাটিকুমরুল-রংপুর ও খুলনা-মংলা মহাসড়ক। চার লেনে উন্নীত করা হবে টঙ্গী-জয়দেবপুর, হাটিকুমরুল-বনপাড়া-রাজশাহী, কাঁচপুর-সিলেট-তামাবিল, বনপাড়া-ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক। এসব প্রকল্প ছক তৈরিসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার স্তরে রয়েছে। জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-হাটিকুমরুল, ফরিদপুর-বরিশাল ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সওজ অধিদপ্তর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ২৫০টি প্রকল্পের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দিয়েছে। এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে সংগতি রাখা ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে উপযোগী মহাসড়ক ব্যবস্থা গড়তেই এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়। এই ১৩ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ব্যয় হবে ২৫ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নের জন্য হাতে নেওয়া সাতটি চার লেন ও একটি আট লেন প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। চার লেনের সাত প্রকল্পের মধ্যে আছে ঢাকা-চট্টগ্রাম, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, বহদ্দারহাট-তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু, নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা, জয়দেবপুর-এলেঙ্গা, রংপুর বাইপাস ও নোয়াখালী চৌমুহনীর প্রধান সড়ক। যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর সেতুটি শুধু আট লেন করা হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম : মহাসড়কের দাউদকান্দি থেকে চট্টগ্রাম অংশে ১৯২.৩ কিলোমিটার অংশ দুই থেকে চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০১০ সালে কাজ শুরু হলেও প্রকল্পে এ যাবৎ অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ। দফায় দফায় বাড়িয়ে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৩০৯ কোটি টাকা। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষাসহ বিভিন্ন কারণে এ সময়ে কাজ শত ভাগ শেষ করা সম্ভব হবে না। সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আমিনুর রহমান লস্কর এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, মাটির অভাব, পরামর্শক নিয়োগে বিলম্ব ও বর্ষার কারণে প্রকল্পের কাজে বিলম্ব হচ্ছে।
জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ : ৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পটি গত জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১০ সালের ১ জুলাই। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ সড়ক বিভাগের ৮৭.১৭ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে পাঁচটি সেতু, একটি উড়াল সেতু ও ৯৮টি কালভার্ট। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৯২ কোটি টাকা। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ব্যয়ও বেড়ে যাবে। প্রকল্প পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান জানান, উন্নয়ন প্রকল্পের ছক সংশোধনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।
বহদ্দারহাট-তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু : বহদ্দারহাট থেকে তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু সংযোগ সড়ক চার লেনে উন্নয়নের এ প্রকল্প ২০১০ সালে শুরু হয়। এরই মধ্যে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে একবার। ২০১৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। গত জুন পর্যন্ত কাজ হয়েছে মাত্র ৫.৫ শতাংশ।
নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা : নবীনগর-ডিইপিজেড-চন্দ্রা মহাসড়ক চার লেনে উন্নয়নের প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১২ সালের জুনে। এখনো ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়ক চার লেনে রূপ নেয়নি। উত্তরাঞ্চল ও বৃহত্তর ময়মনসিংহকে রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এ মহাসড়ক। চার লেনে উন্নীত করার এ প্রকল্পটির প্রথমে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৫ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় ৩০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এ যাবৎ কাজের অগ্রগতি ৯০ শতাংশ। প্রকল্পের সর্বশেষ পরিস্থিতির বিষয়ে মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন খান জানান, এ চার লেনের কাজ অক্টোবরের মধ্যে শেষ হবে।
জয়দেবপুর-এলেঙ্গা : জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে গত ২৩ এপ্রিল প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে একনেক সভায়। মহাসড়ক প্রশস্ত করা, পাঁচটি উড়াল সেতু, ২৭টি ছোট-বড় সেতু ও ৬০টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবি এক হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা ও আবুধাবি ফান্ড ৮৮০ কোটি টাকা দেবে। বাকি অর্থের জোগান দেওয়া হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। ২০১৮ সালের এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে। এখনো প্রকল্পের দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।
যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর : দেশের পূর্বাঞ্চলের ১৬ জেলা থেকে রাজধানী পর্যন্ত যোগাযোগের অন্যতম প্রবেশদ্বার যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর। মহাসড়কের এ অংশটি আট লেনে উন্নীত করার প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১১ সালে। গত জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এখন ২০১৪ সালের মধ্যে শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১২০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এ যাবৎ প্রকল্পে অগ্রগতি মাত্র ৫.২৫ শতাংশ।
রংপুর বাইপাস : ১৬.২৪ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার জন্য প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের নভেম্বরে। ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭ কোটি ৭১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা। এখন তা ১২৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত বছরের জুনে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এখন পর্যন্ত সড়কের বড় একটি অংশের জমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি। রংপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম জানান, ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার সময় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
নোয়াখালী চৌমুহনীর প্রধান সড়ক : ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কের চৌমুহনীতে পাঁচ বছরেও চার কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নয়ন হয়নি। গত জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এই অংশ চার লেন না হওয়ায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, মাদারীপুরসহ ১২টি রুটের যাত্রীরা যানজটের যন্ত্রণায় নিয়ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ২০০৮ সালে ২৩ কোটি ৯৭ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। পরে ব্যয় আরো ১৪ কোটি টাকা বাড়ানো হয়। নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল জানান, প্রকল্পে ৩০০ ফুট জায়গা সম্প্রসারণ করার কাজ শেষ হয়নি।