সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে আলোচনা চাই…মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

তথ্য মন্ত্রণালয় বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের জন্য ‘জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা, ২০১৩’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে বেশ কিছুদিন আগে। মনে হচ্ছে, বর্তমান সরকার খুব শিগগির ‘সম্প্রচার নীতিমালা’ পাস করেই ছাড়বে। কিন্তু আমাদের কথা হলো, সম্প্রচার নীতিমালা নিয়ে এই তাড়াহুড়ো কেন?
আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি জেতে, তাহলে এই নীতিমালার ভাগ্য কী হবে, তাও অনিশ্চিত। নির্বাচনের আগে এ রকম একটা নীতিমালা পাস না করাটাই ঠিক হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে কয়েক মাস পরই আরও পর্যালোচনা করে তারা এই নীতিমালা পাস করতে পারবে। আশা করি, সরকার সে রকমই সিদ্ধান্ত নেবে।
তথ্য মন্ত্রণালয়কে অভিনন্দন। বিলম্বে হলেও মন্ত্রণালয় এ রকম একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ক্রমশ বিকাশমান বৈদ্যুতিন মাধ্যম পরিচালনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটা নির্দেশনা থাকা দরকার ছিল। তবে তা যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে না যায়। আমাদের সরকারগুলো নিয়ন্ত্রণ ছাড়া যেন কিছু বুঝতে চায় না। নিয়ন্ত্রণ করে একদা জনপ্রিয় ‘বিটিভির’ কী হাল হয়েছে, তা তথ্যমন্ত্রী অনুধাবন করতে না পারলেও দেশের সাধারণ টিভি দর্শকেরা ঠিকই অনুভব করেন।
লাইসেন্স দেওয়ার নিয়মাবলিকে এই নীতিমালার বাইরে রাখা হয়েছে সংগত কারণেই। লাইসেন্সের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ হবে। বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের লাইসেন্স প্রদান খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আমলে যাঁরা টিভি লাইসেন্স পেয়েছেন, তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া অন্য বিশেষ যোগ্যতা দেখা যায় না (ব্যতিক্রম খুব কম)। ইতিমধ্যে অনেকে লাইসেন্স অন্য ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রিও করে দিয়েছেন বা প্রধান শেয়ার পরিবর্তন করেছেন। টিভি লাইসেন্স দেওয়া রাজনৈতিক বিবেচনার বিষয় হতে পারে না। লাইসেন্সের জন্য একটা গ্রহণযোগ্য শর্তাবলি থাকা দরকার।
প্রস্তাবিত সম্প্রচার নীতিমালার সবচেয়ে দুর্বল অনুচ্ছেদটি হলো (৩.২) সংবাদ ও তথ্যমূলক অনুষ্ঠান। এতে বলা হয়েছে, ‘অনুষ্ঠানে সরাসরি বা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য বা মতামত প্রচার করা যাবে না।’ তার মানে এই নীতি পাসের পর টিভিতে কোনো রাজনৈতিক টক শো করা যাবে না। কারণ, রাজনৈতিক টক শোতে কোনো দলের বক্তব্য বা মতামত প্রচার ছাড়া আলোচনা তো সম্পূর্ণ হয় না। বিতর্কও হয় না। টক শোতে বিভিন্ন দলের নেতা, সাংসদ ও সমর্থকেরা সাধারণত অংশ নিয়ে থাকেন। তাঁরা তাহলে কী বলবেন টক শোতে? এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, ‘কোনো আলোচনা অনুষ্ঠানে কোনো প্রকার অসংগতিপূর্ণ বিভ্রান্তিমূলক অসত্য তথ্য বা উপাত্ত দেওয়া পরিহার করতে হবে।’ এটা খুব ভালো শর্ত। কিন্তু তথ্যের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করবে কে? ‘বিভ্রান্তিমূলক তথ্য’ কার দৃষ্টিতে? তা ছাড়া এগুলো কখন নির্ধারণ হবে? বেশির ভাগ টক শো তো লাইভ বা সরাসরি প্রচার করা হয়। প্রচারিত হওয়ার পরদিন ভুল তথ্যের সংশোধনী প্রচারের একটা শর্ত থাকতে পারে। এ ছাড়া আর কিছু করার সুযোগ বোধ হয় লাইভ অনুষ্ঠানে নেই। নীতিমালায় এ ধরনের অবাস্তব বক্তব্য থাকলে টিভিতে টক শো প্রচার নিয়ে নানা সমস্যা হতে পারে।
এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, ‘সরকার কর্তৃক সময় সময় অনুমোদিত জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান বাধ্যতামূলকভাবে প্রচার করতে হবে।’ খুবই আপত্তিকর এই বক্তব্য। সরকার অনুমোদিত কোনো ‘জরুরি ঘোষণা’ ও ‘প্রেসনোট’ প্রচার করা যায়। তাই বলে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান? ‘ঘোষণা’ পর্যন্ত ঠিক আছে। সরকারি অনুষ্ঠান প্রচারে প্রাইভেট টিভি বা বেতারকে বাধ্য করা যাবে না। তথ্য মন্ত্রণালয় যে এখন ‘বিটিভির খবর’ প্রচারে প্রাইভেট চ্যানেলকে বাধ্য করেছে, সেটাও আপত্তিকর। এর তিনটা সমাধান আছে। ১) নির্দেশটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করা, ২) বিজ্ঞাপন রেটে প্রাইভেট চ্যানেলকে টাকা পরিশোধ করা, ৩) প্রতিটি প্রাইভেট টিভির একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সংবাদ বুলেটিন’ বিটিভিতে প্রচার করা। তথ্য মন্ত্রণালয় একটি বেছে নিতে পারে।
বিভিন্ন টিভি চ্যানেল কী ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করবে, সেই পরামর্শ দেওয়া সরকারের কাজ নয়। সরকার সম্প্রচার নীতিমালায় বলতে পারে, ‘কী ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না।’ শুধু এটুকু। যে অনুষ্ঠান প্রচার করলে টিভি চ্যানেল লাভজনক ও দর্শকপ্রিয় হবে, চ্যানেল মালিক সেটাই প্রচার করবে। এই স্বাধীনতা চ্যানেল কর্তৃপক্ষের থাকতে হবে। একটা বিনোদন চ্যানেল নিশ্চয় শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করবে না।
বিনোদন অনুষ্ঠান সম্পর্কে বলা হয়েছে (৩.৫.৭): ‘দেশি ও বিদেশি ছবি/অনুষ্ঠানে অশ্লীল দৃশ্য পরিহার করতে হবে। হিংসাত্মক, সন্ত্রাসমূলক এবং দেশীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী কোনো অনুষ্ঠান প্রচার করা যাবে না।’ খুব ভালো কথা। কিন্তু তা শুধু দেশি বিনোদন অনুষ্ঠান বা সিনেমার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। একই স্ক্রিনে দর্শক প্রায় ১০০টি বিদেশি টিভি চ্যানেলের নানা অনুষ্ঠান ও সিনেমা দেখছেন। সেখানে কী প্রচার হচ্ছে, তা পাঠক ভালোই জানেন। সেখানে তো আমাদের নীতিমালা খাটছে না। আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো পরোক্ষভাবে এসব বিদেশি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে দর্শক আকর্ষণ করছে। এটাকে স্ববিরোধিতা ও অসম প্রতিযোগিতা—দুটোই বলা যায়।
জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালায় বিজ্ঞাপন সম্পর্কে অনেক ইতিবাচক কথা বলা হয়েছে, যা প্রশংসাযোগ্য। আমাদের অনেক টিভি বিজ্ঞাপন নীতি-নৈতিকতা উপেক্ষা করছে। কিছু বিজ্ঞাপন শিশু-কিশোর মনস্তত্ত্বেও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ এ রকম নেতিবাচক বিজ্ঞাপন প্রতিদিন বিভিন্ন চ্যানেলে ১০-২০ বার প্রচারিত হচ্ছে। টিভি বিজ্ঞাপনের সচিত্র স্ক্রিপ্ট কোনো কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে পাস করিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা আমরা সমর্থন করি। বিজ্ঞাপন প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় নীতিমালায় থাকতে পারে। টিভিতে যেকোনো অনুষ্ঠানের স্পনসর থাকতে পারে, কিন্তু ‘খবরের’ স্পনসর থাকতে পারে না। ‘অমুক ব্যাংক বাণিজ্য সংবাদ’ ধরনের স্পনসর সাংবাদিকতার মূল চেতনা ও নৈতিকতাবিরোধী। এ রকম চলতে থাকলে কোনো টিভি চ্যানেলই ‘হল-মার্ক ও সোনালী ব্যাংকের’ দুর্নীতির খবর নিজের উদ্যোগে প্রচার করতে পারবে না। দুর্নীতি উৎসাহী প্রতিষ্ঠানগুলো আগেই ‘টিভির খবর’ কিনে ফেলবে। সম্প্রচার নীতিমালায় এ ব্যাপারে বক্তব্য থাকা উচিত।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ‘সম্প্রচারের লাইসেন্স প্রদান ও সামগ্রিক নীতিমালার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও পরিবীক্ষণের জন্য একটি ‘সম্প্রচার কমিশন’ গঠিত হবে (৬.১.১)’। প্রশংসাযোগ্য পদক্ষেপ। বলা হয়েছে, ‘সার্চ কমিটির মাধ্যমে এর চেয়ারম্যান ও অন্য সদস্যদের রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন।’ বড় দুই দলের কোনো সরকার এই কমিশন গঠন করার দায়িত্ব পেলে তারা তাদের দলীয় ব্যক্তিদেরই যে নিয়োগ দেবে, এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ থাকতে পারে না। এর অন্যথা হওয়ার সুযোগ নেই। শুধু এটুকু নিবেদন থাকবে, তাঁরা দলীয় হোক, কিন্তু যেন দলকানা না হয়। একটু বিবেক ও বিচার-বিবেচনা যেন তাঁদের থাকে। এই সম্প্রচার কমিশনের বিচারবোধের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।
এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার প্রতিটি বাক্য নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক না করে পাস করা কিছুতেই উচিত হবে না। আমাদের প্রস্তাব: অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিভিন্ন অংশীগ্রুপের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে পৃথক আলোচনার আয়োজন করা হোক। এসব আলোচনায় বিভিন্ন বিভাগীয় শহর থেকেও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে। যাঁদের সঙ্গে এই খসড়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা উচিত, তাঁরা হলেন: ‘টিভি চ্যানেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন, ২) বিএফইউজে, ৩) টিভি সাংবাদিক, টক শোর প্রযোজক, উপস্থাপক ও নেতৃস্থানীয় আলোচক, ৪) নাগরিক সমাজের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি, ৫) বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক প্রতিনিধি, ৬) শিল্পীসমাজের প্রতিনিধি, ৭) গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও অ্যাকটিভিস্ট প্রতিনিধি, ৮) বিজ্ঞাপনী সংস্থার প্রতিনিধি ইত্যাদি। একই আলোচনায় লাইসেন্স প্রদানের প্রস্তাবিত ‘সমন্বিত নীতিমালা’ও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যাতে একই সভায় দুটি বিষয়েই মতামত পাওয়া যায়। লাইসেন্স প্রদানের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর শর্তাবলি নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার।
লাইসেন্স প্রসঙ্গে খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, ইতিমধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেতার ও টিভিকে এই নীতিমালার অধীনে আবার লাইসেন্স গ্রহণের ব্যবস্থা নিতে হবে (২-১-৫)। এই ধারাটিও গ্রহণযোগ্য নয়। কেন তাদের নতুন করে লাইসেন্স নিতে হবে? সরকার তাদের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই লাইসেন্স দিয়েছে। এখন নতুন নীতিমালার অধীনে একটা অঙ্গীকারপত্রে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া যায়। যা বর্তমান লাইসেন্সের সঙ্গে সংযোজিত হবে। নতুন লাইসেন্স গ্রহণের নামে মালিকদের হয়রানি করার জন্য এবং বড় অঙ্কের ফি আদায় করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় একটা সুযোগ তৈরি করেছে। এটা বাদ দিতে হবে।
সম্প্রচার নীতিমালার কোনো কোনো ধারা দেখে মনে হয়, সরকার বৈদ্যুতিন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে, বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের প্রায় ৯০ ভাগই বেসরকারি খাতে। এই খাতে সরকারের বিনিয়োগ নেই। উল্টো এই খাত সরকারকে বিপুল পরিমাণে কর দিয়ে থাকে। কাজেই সরকার এই সেক্টরে কোনো খবরদারি করার চেষ্টা করলে তা যুক্তিসংগত হবে না। দেশে বৈদ্যুতিন গণমাধ্যমের বিকাশ যেন মসৃণ হয়, সে জন্য নীতিমালার মাধ্যমে সরকার সহযোগিতা করবে, এটাই প্রত্যাশা।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।