সম্মান চান, ‘সুবর্ণ নাগরিক’ বিশেষণ চান না প্রতিবন্ধীরা

pro

প্রতিবন্ধী অধিকার নিশ্চিত করতে দুই বছর আগে পাস হয়েছে একটি আইন। আইনটির দুটি ধারায় বৈষম্য নিষিদ্ধসহ বেশ কিছু সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু গেজেট প্রকাশ না করে ধারা দুটির কার্যকারিতা স্থগিত করে রাখা হয়েছে। ফলে আইনটির সুবিধা ভোগ করতে পারছে না প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।

সেই প্রাপ্য ও আইনগত ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত না করে সরকার এখন প্রতিবন্ধীদের দিতে চাইছে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ বিশেষণ। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামসহ অন্য সংগঠনগুলো বলেছে, সরকার একপক্ষীয়ভাবে বিষয়টি প্রতিবন্ধীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। এ নিয়ে তাদের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনাও করা হয়নি।
অধিকাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাঁদের নিয়ে কর্মরত সংগঠনগুলো বলছে প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত না করে খামোখা তাঁরা আলাদা কোনো খেতাব বা উপাধি চান না। তাঁদের মতে, প্রতিবন্ধী জনগণ যেখানে নাগরিক অধিকারই পাচ্ছে না সেখানে বাহারি নাম দিয়ে কী হবে? এতে করে বরং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা বেশি করে বৈষম্যের শিকার হবে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সরকার ‘প্রতিবন্ধী’ শব্দটিকে নেতিবাচক মনে করলেও প্রতিবন্ধীরা তা মনে করছেন না।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেউ কেউ বলেছেন সরকার তাঁদের এ ‘উপাধি’ দিতে চাইলে তাঁদের আপত্তি নেই। কিন্তু এ উপাধি পেলে কোন কোন ক্ষেত্রে সুবিধা পাওয়া যাবে তা আগে স্পষ্ট করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের নাম দেওয়া আর ভাওতাবাজির মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আগের মন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ‘প্রতিবন্ধী’ না বলে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ নামে ডাকতে চান। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিলেও এ নাম নিয়ে সরকারিভাবে কোনো আদেশ বা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়নি। অথচ ২০১৩ সালের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাতা প্রদান কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালায় (সংশোধিত) যে পরিচয়পত্রের নমুনা দেওয়া হয়েছে সেখানে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পরিচয়পত্র লেখার পাশে লাল অক্ষরে ‘সুবর্ণ নাগরিক’ কথাটি লেখা হয়েছে। লেখাটি হলুদ রং দিয়ে মার্ক করা। তবে ইংরেজিতে পরিচয়পত্রের নমুনায় এ ধরনের কিছু লেখা নেই।
প্রতিবন্ধীদের জীবনমান উন্নয়নে কর্মরত সিএসআইডির নির্বাহী পরিচালক খন্দকার জহুরুল আলম নিজে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। ক্র্যাচে ভর না দিয়ে তিনি হাঁটতে পারেন না। জহুরুল আলম জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামে দীর্ঘ ২১ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খেতাব বা উপাধি দেওয়াকে সরকারের ‘চালাকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘সুবর্ণ নাগরিক বলেটলে কোনো লাভ নেই। আমরা এ ধরনের উপাধি নিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না।’
ছোট বেলায় পোলিও রোগে আক্রান্ত হন সালমা মাহবুব। তিনি বর্তমানে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সুবর্ণ নাগরিক কথাটি পছন্দ করছি না। আমরা কোনো খেতাব চাই না। অর্ধেক ভাড়া নিতে হবে বলে প্রতিবন্ধীদের বাসেই তুলতে চায় না। হুইল চেয়ার নিয়ে তো আমরা যানবাহনে উঠতেই পারি না। আমাদের নাগরিক হিসেবেই গণনা করতে চায় না। সেখানে খেতাব বা বাহারি নাম দিয়ে কি করব? ’
সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি কতটা উদাসীন তার উদাহরণ দিতে গিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা জানান, ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন পাস হয়। ৯ অক্টোবর ২০১৩ থেকে আইনটি কার্যকরও হয়। কিন্তু সরকারের পৃথক গেজেট প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত আইনের ৩১ ও ৩৬ ধারার কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়।
ধারা ৩১ অনুযায়ী প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিবন্ধন এবং পরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে এবং পরিচয়পত্র না পাওয়া পর্যন্ত কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই আইন ও অন্যান্য আইনের সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
আইনের ৩৬ ধারা অনুযায়ী প্রতিবন্ধিতার ভিত্তিতে সকল প্রকার বৈষম্য নিষিদ্ধ এবং প্রতিবন্ধিতার শিকার ব্যক্তি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী। তবে ধারা দুটোর কার্যকারিতাই স্থগিত করা। আইনের বিধিমালাও তৈরি হয়নি।
অবশেষে সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতকে রুল জারি করতে হয়েছে। ১৮ মে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ধারা দুটি কার্যকর করতে কেনো গেজেট প্রকাশ করা হবে না তা জানতে চেয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি রুল জারি করেছেন। আইন অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা সংক্রান্ত কমিটিসমূহ কেনো গঠন করা হবে না এবং এ আইনের বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশ কেন প্রদান করা হবে না সে মর্মে চার সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রদান করেছেন।
আইন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্বপন চৌকিদার বলেন, আইনের বিভিন্ন ধারা বিশেষ করে ৩৬ নম্বর ধারা কার্যকর না করলে বৈষম্য পিছু ছাড়বে না। আইন বাস্তবায়ন না করে শুধু বাহারি নাম দিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোনো লাভ হবে না।
জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের পরিচালক নাফিসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় আইন, জাতিসংঘের সনদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সম্পর্কে বলা আছে। আইন এবং সনদ বাস্তবায়ন করলে আর বাড়তি বিশেষণের দরকার নেই। বিভিন্ন সময় ফোরামের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে এ কথা জানানোও হয়েছে।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন ভিপসের সাধারণ সম্পাদক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নাজমা আরা বেগম শোনালেন ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম যাতায়াতের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ট্রেনে প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা আছে। ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা আছে। তবে এসব সুযোগসুবিধা শুধু ‘নন এসি’ বগির জন্য।
স্টেশনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা কাউন্টার থাকলেও সে কাউন্টার থেকে কখনোই নাজমা টিকিট পাননি। অর্ধেক ভাড়ার জন্য প্রতিবন্ধী সনদ দেখালেও লাভ হয় না, বিভিন্ন ‘বড় স্যার’ দের কাছ থেকে অনুমতি এনে দেখাতে হয়। ফলে দ্বিগুণ, তিনগুণ টাকা খরচ করে দালালদের কাছ থেকে টিকিট করে বাড়ি যান তিনি।
চট্টগ্রামের ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ভাস্কর ভট্টাচার্য ‘সুবর্ণ নাগরিক’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টিতে তেমনভাবে বিরোধিতার কিছু দেখছেন না বলে জানালেন। তবে তাঁর মতে, এ নাম পেলেই কী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবন পাল্টে যাবে? সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও কি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দায়িত্ব নেবে? যদি এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন না ঘটে তবে নামেরও কোনো দরকার নেই।
দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাস্কর ভট্টাচার্য জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদের ‘স্ট্যাটপার্টি কনফারেন্স’ এ যোগ দিতে যাচ্ছেন আগামী মাসে। নিউইয়র্কে তিনি কনফারেন্সে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন।
ভাস্কর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমানের ম্যানুয়ালে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা একা চলাফেরা করতে পারবেন না বলে উল্লেখ থাকায় হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের এটিএম কার্ড পাচ্ছেন না দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। এসব জায়গায় পরিবর্তন না এলে নাম পেলেই কি, না পেলেই কি।’
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা  বলেন, একজন মন্ত্রী যেহেতু ‘সুবর্ণ নাগরিক’ ঘোষণা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তাই বিষয়টি নিয়ে কেউ আর প্রতিবাদ করেনি। এখন সেই মন্ত্রী দায়িত্বে নেই। তবে তাঁর ইচ্ছার বিষয়টি নাকচ করা হয়নি, আবার সরকারি আদেশও জারি করা হয়নি। তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এ ধরনের খেতাব দিতে চাইলে অবশ্যই সরকারি আদেশ জারি করতে হবে।

সম্প্রতি যোগ দেওয়া সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল ইসলাম  বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ‘সুবর্ণ নাগরিক’ হিসেবে ঘোষণা কার্যকরী করতে হলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেই তা করা হবে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের (তিনিও সম্প্রতি যোগ দিয়েছেন) মহাপরিচালক গাজী মোহাম্মদ নুরুল কবীরও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যত সুন্দর নামই দেওয়া হোক তা জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার বিষয়ক সনদ বা দেশীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না সেসব বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।