সরকারি ক্যাডার ব্যবস্থাপনায় তুঘলকি দৃষ্টিভঙ্গি…এ এম এম শওকত আলী

দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশে কাজের ধরন ও দায়িত্ব পরিধি অনুযায়ী সিভিল সার্ভিসকে একাধিক ক্যাডারে বিভক্ত করা হয়। প্রশাসনিক স্বার্থেই এ ধরনের ব্যবস্থা। তবে উন্নত বিশ্বে এ ধরনের ব্যবস্থা খুব লক্ষ করা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশে প্রদেশ বা রাজ্য আছে, সেসব দেশে কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস ও প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিস রয়েছে। এ প্রথা ভারত ও পাকিস্তানে চালু আছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে এ প্রথা চালু হয় এবং আজও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে ১৯৭৩ সাপরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে এ ব্যবস্থার কিছু মৌলিক পরিবর্তন করা হয়েছে। ভারতে এর কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। ১৯৭১ সাল-পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার করার জন্য সময় সময় উদ্যোগ নিলেও এর বাস্তবায়ন সম্পূর্ণভাবে করা হয়নি। ১৯৮০ সালে যেটা হয়েছে তা হলো, বিভিন্ন সিভিল সার্ভিসের জন্য বেতন-ভাতা সংক্রান্ত গ্রেড প্রথার প্রবর্তন। এর সঙ্গে সব ধরনের সিভিল সার্ভিসের জন্য ৩০টি ক্যাডার। এর ফলে ১৯৭১ সাল-পূর্ববর্তী সময়ের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস ও প্রায় ২৯টি বিভিন্ন প্রাদেশিক চাকরি কাঠামোকে একীভূত করার লক্ষ্যে ৩০টি ক্যাডারের সৃষ্টি। ১৯৭১ সাল-পূর্ববর্তী সময়ে সচিবালয়ে তিন ধরনের চাকরিরীতি ছিল। এক, কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্য, প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের সদস্য ও প্রাদেশিক সচিবালয় সার্ভিসের সদস্য। অন্যান্য সার্ভিসের সদস্যদের জন্য যেমন কৃষি, স্বাস্থ্য, পুলিশ ও প্রকৌশলীদের সচিবালয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল না। ১৯৭১ সাল-পরবর্তী সময়ে এ ধরনের সার্ভিস থেকে কিছু ব্যক্তি সচিবালয়ের উচ্চ পদে নিয়োগ লাভ করেন।
১৯৮০ সাল থেকেই শুরু হয় অন্যান্য সার্ভিসে কর্মরত ব্যক্তিদের সচিবালয়ের পদে আসার সুযোগ। এ সুযোগ সৃষ্টির জন্য ওই সব সার্ভিসের তীব্র দাবি ছিল। বিভিন্ন সরকার সে দাবি উপেক্ষা করেনি। ওই সময় অলিখিত নীতি ছিল সব সার্ভিসের জন্য সচিবালয়ের পদে আসার সমান সুযোগ সৃষ্টি। বিষয়টি নিঃসন্দেহে জটিল ছিল। এ বিষয়ে ১৯৮২ সাল-পরবর্তী সময়ের সামরিক সরকার তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে একটি কমিটিও গঠন করে। এর আগের সামরিক শাসনামলে ১৯৭৯ সালে সচিবালয়ের পদে আসার সমান সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সিনিয়র সার্ভিস পুল গঠন করা হয়। এ জন্য একটি বিধিও প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত বিধির প্রধানত দুটি বৈশিষ্ট্য ছিল। এক, ওই বিধি জারি হওয়ার সময় যে কর্মকর্তারা উপসচিব ছিলেন, তাঁরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিনিয়র সার্ভিস পুলভুক্ত হবেন। দুই, অন্যদের জন্য উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য পাবলিক সার্ভিস কমিশনের দ্বারা পরীক্ষার মাধ্যমে সচিবালয়ের উপসচিব হতে হবে। এ বিষয়ে কমিশন যথারীতি পরীক্ষার দিন, তারিখ ও সময় ঘোষণা করলেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ঘোষণাপত্র বাতিল করে। এর কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ আজ পর্যন্ত জানা যায়নি। যা জানা গেছে তা হলো, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারসহ অন্যান্য ক্যাডারের অপেক্ষাকৃত কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা পরীক্ষার বিষয়টি মানতে রাজি হয়নি। ১৯৮২ সাল-পরবর্তী সময়ে তৎকালীন নৌবাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠিত হয়, সে কমিটি কোন ক্যাডারের সচিবালয়ে আসা ও সার্বিকভাবে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে সে বিষয়টি পরীক্ষা করে সিনিয়র সার্ভিস পুল প্রথা অক্ষুণ্ন রাখার প্রস্তাব দেয়। কমিটির মতে, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারেরই উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় কম। পরবর্তী পর্যায়ে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় (বর্তমানে জনপ্রশাসন) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ক্যাডারভিত্তিক উপসচিব পদের জন্য কোটা প্রথা ঘোষণা করে। উপসচিব পদে পদায়নের জন্য প্রশাসন ব্যতীত অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের আবেদনের ও সম্ভবত সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে উপসচিব পদে নিয়োগ করা হয়। বাস্তবে দেখা যায়, অন্যান্য ক্যাডার থেকে কর্মকর্তারা এ পদে আসার জন্য অতটা আগ্রহী নয়। এর কারণ কী তা অনুসন্ধানযোগ্য। ১৯৮২ সালের সামরিক সরকার শেষ পর্যন্ত সিনিয়র সার্ভিস পুল কাঠামো বিলুপ্ত ঘোষণা করে।
বলা বাহুল্য, সিনিয়র সার্ভিস পুলের আওতায় পরীক্ষা প্রথা প্রবর্তন করার নিয়মের মধ্যে মেধা যাচাই করার সুযোগ ছিল। সচিবালয়ের কাজের ধরন বিভাগভিত্তিক কাজের তুলনায় ভিন্নতর। সচিবালয়ের পদে নিয়োগ মেধা যাচাই করার মাধ্যমেই করা শ্রেয়। এসব পদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উচ্চতর পর্যায়ের জ্ঞান ও যোগ্যতা প্রয়োজন। কারণ সচিবালয়ের কাজের মধ্যে রয়েছে নীতি প্রণয়ন, সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর প্রদানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে সহায়তা প্রদান ও বিভাগীয় কার্যক্রমের নিবিড় পরিবীক্ষণ। যেসব উন্নত দেশে ক্যাডার প্রথা খুব একটা দৃশ্যমান নয়, সেসব দেশেও সচিবালয়ের পদের জন্য পৃথকভাবে মেধা যাচাইয়ের ভিত্তিতে কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হয়। অনুন্নত দেশে, বিশেষ করে বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর দেশে এ ধরনের প্রথা কঠোরভাবে কার্যকর করার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কারণ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বৈশ্বিক পরিবেশে কাজ করে থাকেন। অন্যান্য দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান সচিবালয়ের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। দুর্ভাগ্যক্রমে প্রথম থেকেই রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেননি। ধরে নেওয়া হয়েছে, সব ধরনের কর্মকর্তাই সমপর্যায়ের দক্ষতা ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ। বাস্তবে তা কোনো দেশেই হয়নি। বাংলাদেশেও হবে না। রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের দক্ষতা ও মেধাসম্পন্ন আমলাতন্ত্র সৃষ্টিতে ব্যর্থতার খেসারত সময় সময় দৃশ্যমান। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত খোদ প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থতার বিষয় একাধিকবার উচ্চারণ করেছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত প্রদানে শ্লথগতির জন্য অন্যান্য কারণও উল্লেখ করা যায়। এর প্রধান কারণ হলো, প্রশাসনে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতাকে উপেক্ষা করে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে উচ্চতর পদে নিয়োগ করা। অন্য একটি কারণ হলো, নীতিনির্ধারকদের তুষ্টির জন্য সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নীতিনির্ধারকদের আদেশের অপেক্ষা করা। ক্ষমতাসীন দলের তুষ্টি ও আনুগত্য লাভের জন্য কর্মকর্তারা যথাসময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরত থাকেন। এভাবেই প্রশাসনে দলীয়করণের বিষয়ের যে প্রক্রিয়া ১৯৯১ সাল-পরবর্তী সময় থেকে চালু হয়, তা অলিখিত হলেও এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
বিভিন্ন ক্ষমতাসীন দলের এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি প্রশাসনিক দক্ষতা ও মেধাকে বিধ্বস্ত করেছে। মিডিয়া বিষয়টি বারবার প্রচার করলেও এর কোনো পরিবর্তনই দৃশ্যমান নয়। এর একটি বড় উদাহরণ হলো, নিয়মিত পদের সংখ্যার বিপরীতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অতি আধিক্য। এ বিষয়ে সেপ্টেম্বর মাসে দুটি দৈনিকে বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত কালের কণ্ঠে এ বিষয়ে শিরোনাম ছিল ‘প্রশাসনের পদে ব্যক্তি বড়’। পরের দিন অর্থাৎ ১৩ সেপ্টেম্বর একটি ইংরেজি দৈনিকে এ-সংক্রান্ত সংবাদের শিরোনাম ছিল Promotion spree in civil admin। এর উপশিরোনামে ছিল যুগ্ম সচিবের সংখ্যা প্রাথমিক নিয়োগকৃত (entry-level) কর্মকর্তার সংখ্যার চেয়ে বেশি। যুগ যুগ ধরে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক রীতি অনুযায়ী এটা হওয়ার কোনো যুক্তি নেই। কারণ উচ্চতর পদে নিয়োগের জন্য মেধা ও দক্ষতা যাচাই প্রয়োজন।
এ বিষয়ে যে পরিসংখ্যান মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যায়, অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ে পদ আছে ১০৭ অথচ এ পর্যায়ে পদোন্নতি প্রাপ্তের সংখ্যা ২৩৯। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি। বলা হয়েছে, আরো কিছু সংখ্যক কর্মকর্তার এ পদে পদোন্নতি হবে। যুগ্ম সচিব পর্যায়ে নিয়মিত পদের সংখ্যা ৪৩০, পদোন্নতি প্রাপ্তের সংখ্যা এক হাজার ১৩। এখানেও দ্বিগুণের বেশি। উপসচিব পর্যায়ে নিয়মিত পদের সংখ্যা ৮৩০ অথচ কর্মকর্তার সংখ্যা এক হাজার ৩১৬। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক যথার্থই বলেছেন, প্রজাতন্ত্রের স্বার্থে এসব পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থে ও তাঁদের সামাজিক মর্যাদার খাতিরে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এমন পদক্ষেপের কারণে যাঁরা পদোন্নতি পেয়েছেন, তাঁরা মূল পদেই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন। অর্থাৎ কাজের কোনো উন্নত পর্যায়ের উৎকর্ষের প্রয়োজন নেই। গত প্রায় এক দশক ধরে নিয়মিত পদ শূন্য না থাকা সত্ত্বেও অধিকসংখ্যক পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়ে মিডিয়াসহ সুশীলসমাজ সব ক্ষমতাসীন সরকারেরই সমালোচনা করেছে। কিন্তু কোনো ফল হয়নি। এখন এ ধরনের পদোন্নতির নীতির জন্য যুগ্ম সচিব উপসচিবের পদে কাজ করছেন। একইভাবে অতিরিক্ত সচিব যুগ্ম সচিবের কাজ করছেন। অতীতে কয়েকটি নির্দিষ্ট কারণে নিয়মিত পদ না থাকায় পদোন্নতি দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হতো। তাঁদের সংখ্যা খুবই স্বল্পসংখ্যক ছিল। বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে বেশি দিন কোনো কর্মকর্তাকে রাখা হতো না। ইদানীংকালে সংখ্যার অধিক্যহেতু মাসের পর মাস বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে কয়েক শ কর্মকর্তা থাকার জন্য হাইকোর্টে একটি রিটও হয়। অভিযোগ করা হয়, এর ফলে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। এ মামলার রায় এখনো জানা যায়নি। অনুমান করা যায়, এ ধরনের বিব্রতকর অবস্থা এড়ানোর জন্যই এখন পদোন্নতিপ্রাপ্তদের নিম্নপদে পদায়ন করা হচ্ছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, এর ফলে প্রশাসনের গুণগত মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
অযৌক্তিক পদোন্নতির আরো একটি নেতিবাচক প্রভাব এখন প্রশাসনে দৃশ্যমান। সব সময়ই অভিযোগ করা হয়েছে যে কনিষ্ঠ কর্মকর্তারা জেষ্ঠ্য কর্মকর্তাদের আগে পদোন্নতি পেয়েছেন। কারণ প্রশাসনে দলীয় প্রভাব। এর ফলে বেশির ভাগ মন্ত্রণালয়ের চেইন অব কমান্ডও ক্ষুণ্ন হয়েছে; যা সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার জন্য মঙ্গলজনক নয়। উদ্ভূত অস্বস্তিকর প্রশাসনিক পরিবেশ অচিরেই দূর করা যাবে না। তবে লাগামহীন পদোন্নতির রশি এখনই টেনে ধরার সময় এসেছে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা