সরকারের এক লাখ কোটি টাকা ব্যাংকে অলস

সুদের আশায় আমানত হিসেবে রেখেছে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান

ধার করে বাজেটে ব্যয়ের সঙ্গে আয় মেলানোর চেষ্টা করেন অর্থমন্ত্রীরা। রাজস্ব ব্যয় মেটাতে গিয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের বড় অংশই ব্যয় করতে হয়। ফলে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে হয় অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিয়ে। সঙ্গে ভরসা থাকে বিদেশি ঋণ ও অনুদান। ২৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে কম দৌড়ঝাঁপ করতে হয়নি সরকারকে। অথচ এ ধরনের চার-চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণের অর্থ সরকারেরই রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পড়ে আছে বিভিন্ন ব্যাংকে। এ অর্থের পরিমাণ চলতি অর্থবছরের বাজেটের মোট আকারের অর্ধেকের কাছাকাছি। সুদ পাওয়ার আশায় আমানত হিসেবে ব্যাংকে রাখা আছে টাকাগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাস শেষে বিভিন্ন ব্যাংকে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৬৫৪ কোটি ২৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এ টাকার মধ্যে ৬২ হাজার ২৩৯ কোটি আট লাখ চার হাজার টাকা বিভিন্ন ব্যাংকের ঢাকা শহরে অবস্থিত শাখায় আমানত রাখা আছে। বাকি ৩৭ হাজার ৪১৫ কোটি ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টাকা রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকের মফস্বলের শাখাগুলোতে। সরকারের বিভিন্ন সেবার ফি ও চার্জ বাবদ এসব অর্থ আয় করে জমিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
সারা দেশে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ফি ও চার্জ বাবদ অর্থ আয় করে থাকে। ওই সব প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য খরচ সরকার বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সেবার বিপরীতে যে অর্থ আয় করে, তা খরচ হয় না। অথচ নিয়মানুযায়ী এসব টাকা সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়ম হলো, ওই সব অর্থ যত দ্রুত সম্ভব সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়া। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই তা সরকারের তহবিলে জমা না দিয়ে ব্যাংকে আমানত হিসেবে রেখে দিচ্ছে সুদের আশায়। এটা যৌক্তিক নয়। আর সরকারের কাছেও এসব অর্থের কোনো তথ্য থাকে না।’ তিনি বলেন, এসব অর্থ কোষাগারে জমা হলে ব্যাংকগুলো থেকে সরকারকে এত বেশি ঋণ নিতে হতো না। অর্থের অভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজও ব্যাহত হতো না। তিনি আরো বলেন, সরকারের উচিত এ ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর জমানো অর্থ নিজস্ব কোষাগারে জমা নেওয়ার ব্যবস্থা করা। তবে এসব অর্থ যেন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার দুই লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। বাকি ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকার জন্য অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ এবং বিদেশি দান ও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব আয়ের অর্থ ব্যাংকে আমানত হিসেবে জমা না রেখে তা সরকারের কোষাগারে জমা রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো তা না করে মুনাফার আশায় টাকাগুলো ব্যাংকেই আমানত রেখে দিচ্ছে। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা রাখা হলে বাজেট ঘাটতির বদলে উদ্বৃত্ত বাজেট প্রণয়ন সম্ভব হতো অর্থমন্ত্রীর পক্ষে।
সরকারের শেষ অর্থবছরে পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় আগের চেয়ে বাড়বে- এমন বিবেচনায় মাস দুয়েক আগে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের মুনাফা বা রাজস্ব আয়ের অর্থ ব্যাংকে আমানত না রেখে সরকারের কোষাগারে জমা দেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশনায় তেমন কোনো সাড়া মেলেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রতিবেদন চায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে চিঠি লিখে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের সুদহার কমানোর সুপারিশ করে। এসব কারণে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নিতেই এ প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ১২ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংকে আমানত রয়েছে ১৯ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। আর পাবলিক অনার্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের পরিমাণ ৫৭ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোর আমানত দুই হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা, আমানত গ্রহণকারী ব্যাংকবহির্ভূত সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের পরিমাণ ৮৭৬ কোটি টাকা, বীমা কম্পানি ও পেনশন ফান্ড থেকে দুই হাজার ৮৩২ কোটি টাকা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ তিন হাজার ৫২৩ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান বিবেচনায় খাদ্য মন্ত্রণালয় ও তার আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানতের পরিমাণ ১৭ কোটি টাকা। বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়গুলোর আমানত প্রায় ২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, জেলা কমিশনারের অফিসের আমানত রয়েছে ২৮১ কোটি টাকা, সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের প্রায় সাত কোটি টাকা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন অধিদপ্তরের প্রায় ৪২ কোটি টাকা, সামরিক চিকিৎসা সার্ভিস অধিদপ্তরের ১৯৪ কোটি টাকা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ১৪২ কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৪১৪ কোটি টাকা, জাতীয় সঞ্চয় পরিদপ্তরের এক হাজার ৫২ কোটি টাকা, কর কমিশনারের অফিসের রয়েছে ১৫৭ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ৬০ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে আমানত হিসেবে রাখা রয়েছে।