সিপিবি-বাসদের সমাবেশে ছাত্রলীগের হামলা

‘সরকারের বিরুদ্ধে বলছিস কেন’, বলেই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ওপর হামলা

সিলেটে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বিভাগীয় সমাবেশে হামলা করেছে ছাত্রলীগ। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে হামলাকারীরা সমাবেশ মঞ্চে থাকা সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমকে টেনেহিঁচড়ে মঞ্চ থেকে নামিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। আজ রোববার বিকেলে নগরের কোর্ট পয়েন্টে সমাবেশ চলাকালে ছাত্রলীগের আনন্দমিছিল থেকে এ হামলা চালানো হয়।

সমাবেশে বক্তারা সরকারবিরোধী বক্তব্য রাখায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়ে এ হামলা চালান। হামলা ঠেকাতে এ সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে ছাত্র ইউনিয়ন ও সিপিবির আরও প্রায় ১৫ নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরা শর্টগানের গুলি ছুড়ে হামলা ঠেকান। এ সময় ছাত্রলীগের সঙ্গে পুলিশের এক দফা সংঘর্ষ হয়। এতে সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) ছাত্রলীগের সাতজন আহত হন।

হামলার পর আবার সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। হামলার প্রতিবাদে কাল সোমবার সিলেটে আধাবেলা হরতালের ঘোষণা দিয়ে সমাবেশ শেষ করা হয়। এ হরতালে সমর্থন দিয়েছে বিএনপি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ প্রথম আলো ডটকমকে এ কথা জানান।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কোর্ট পয়েন্টে সমাবেশ শুরু হয়। পৌনে পাঁচটার দিকে ছাত্রলীগের কর্মীরা সমাবেশ স্থলের উদ্দেশে অতর্কিতভাবে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। এরপর মুহুর্মুহু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। ছাত্রলীগের কর্মীরা সমাবেশ স্থলের দিকে আসা শুরু করলে ছাত্র ইউনিয়ন, সিপিবি ও বাসদের কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের প্রতিরোধে ছাত্রলীগের কর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। পাঁচ মিনিট পর পুনরায় ছাত্রলীগের কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে সমাবেশ স্থলে পৌঁছায়। সমাবেশে পৌঁছে তারা শতাধিক চেয়ার ও মঞ্চ ভাঙচুর করেন। এ সময় উভয় পক্ষে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সহিদুজ্জামান পাপলু, ছাত্র ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক সপ্তর্ষি দাস, প্রচার সম্পাদক সজিব এষ, বিশ্ব ভট্টাচার্যসহ ১৫ জন আহত হন। তাঁরা সবাই বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা নিয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হামলা চলাকালে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিরণ মাহমুদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা মঞ্চে উঠে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের ওপর চড়াও হন। ‘সরকারের বিরুদ্ধে বলছিস কেন—জামায়াতের চর…!’ প্রভৃতি কথা বলে টানাহেঁচড়া ও চেয়ার ছোড়াছুড়ি শুরু করেন। ছাত্রলীগের কর্মীদের টানাহেঁচড়ায় সেলিমের পাঞ্জাবি ছিঁড়ে যায়। তাঁর বাঁ হাতে আঘাত করলে তিনি আহত হন। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে মঞ্চে উঠে ছাত্রলীগের কর্মীদের প্রতিহত করেন। কিছুক্ষণ সংঘর্ষে শেষে ছাত্রলীগের কর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হন। এরপর সাড়ে পাঁচটার দিকে সমাবেশ পুনরায় শুরু হলে ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলার চেষ্টা চালান। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের কিছু বিক্ষুব্ধ কর্মী পাল্টা প্রতিরোধের আহ্বান জানান। সংঘর্ষ এড়াতে র্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রলীগের কর্মীদের লক্ষ্য করে শর্টগানের গুলি ছুড়লে তাঁরা সিলেট সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে গিয়ে অবস্থান নেন।

নগর ভবনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিরন মাহমুদ, সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কয়েকটি পক্ষ লাঠিসোঁটা নিয়ে অবস্থান করছে। এ সময় ক্ষুব্ধ কর্মীদের ‘কমিউনিস্টরা জামায়াত-শিবিরের চর’ বলে চিত্কার করে গালাগাল দিতে শোনা যায়। হামলার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিরন মাহমুদ তাত্ক্ষণিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

তবে জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন খান প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সিলেট আগমন উপলক্ষে তাঁরা তালতলা এলাকা থেকে আনন্দমিছিল বের করেন। মিছিলটি সমাবেশ স্থলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর ধর বলায় ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করেন।’

সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতিকে লাঞ্ছিত করা ও হামলায় সভাপতির নেতৃত্ব দেওয়া প্রসঙ্গে ফরহাদ বলেন, ‘আমরা কেউ আসলে হামলা করিনি। আমরা শুধু ক্ষুব্ধদের নিয়ন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছি।’

আনন্দমিছিলে নেতৃত্ব দেওয়া জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি এমদাদ রহমান অভিযোগ করেন, ‘সমাবেশ থেকে সরকার ও ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছিল। এ নিয়ে কিছু কর্মী-সমর্থক ক্ষুব্ধ ছিল। আমাদের ধারণা, সমাবেশে জামায়াত-শিবিরের চরেরা ছিল এবং তাঁরাই অঘটন ঘটিয়েছে।’

সিপিবি ও বাসদ কর্মীদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাত্রলীগের কর্মীদের হামলায় সহযোগিতা করেছে। সিপিবি সিলেটের সভাপতি বেদানন্দ ভট্টাচার্য প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা চালিয়ে কর্মীদের রক্তাক্ত করেছে। অথচ পুলিশের ভূমিকা ছিল নীরব দর্শকের মতো।’

পুলিশ সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছে জানিয়ে সিলেট মহানগর পুুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ আয়ূব প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘হামলা ঠেকাতে গিয়ে কোতোয়ালির ওসি আখতার হোসেনসহ পুলিশের তিন সদস্য আহত হয়েছেন। এর পরও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচীন নয়।’

খবর পেয়ে সন্ধ্যার পূর্বে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুজ জহির চৌধুরী, নগর আ.লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ সময় হামলাকারী ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এ ঘটনার পেছনে জামায়াত-শিবিরের প্ররোচনা থাকতে পারে বলে তাঁদের অবহিত করেন।

এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়হামলার প্রতিক্রিয়ায় সেলিম

হামলার পূর্বে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন নেতা সমাবেশে বক্তব্য দেন। হামলার পর সমাবেশ আবার শুরু হলে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান সমাবেশে বক্তব্য দেন। এর আগে সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমদ, বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজসহ সিপিবি ও বাসদের নেতারা।

সমাবেশে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘হালুয়া-রুটির ভাগ পাওয়ার জন্য বক্তব্য দিতে আসিনি। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি কীভাবে সম্ভব হবে, তার ভাবনা-চিন্তা বিনিময় করতেই এসেছি। মানুষের মুখে কীভাবে হাসি ফোটানো যায়, সেটার পরামর্শ দিতে এসেছি। অথচ যেভাবে সরকারদলীয় ছাত্রলীগের নামধারীরা আমাদের সমাবেশে হামলা চালিয়ে কর্মী-সমর্থকদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে, এতে কী প্রমাণ করে? এটাই প্রমাণ করে, এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়।’

জেলা সিপিবির সভাপতি বেদানন্দ ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সমাবেশের শুরুতেই গণসংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মাহদুজ্জামান বাবু।