জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এ জন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতার কাছে বিরোধী দলের সাংসদদের নামও চেয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, সংবিধান অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর থেকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ প্রস্তাব দেন। তিনি সব দলকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করার ইচ্ছা পোষণ করে বলেন, ‘আমি বিরোধীদলীয় নেতাকে অনুরোধ করছি যে, তিনি আমার এই ডাকে সাড়া দেবেন। আমার এ অনুরোধ তিনি রক্ষা করবেন এবং আমাদের সদিচ্ছার মূল্য তিনি দেবেন।’
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরেন। তবে অতীতের মতো বিরোধী দলের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেননি।
ভাষণে শেখ হাসিনা সংবিধানের নানা ধারা-উপধারার উদ্ধৃতি দিয়ে ২৫ অক্টোবর থেকে ৯০ দিনের (২৪ জানুয়ারি) মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে তিনি বিরোধী দলের কাছেও পরামর্শ চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘৯০ দিনের মধ্যে যাতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সে জন্য আমি সব দলের সঙ্গে, বিশেষ করে মহাজোটের সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতিকে যথাসময়ে লিখিত পরামর্শ দেব। এ ক্ষেত্রে আমি বিরোধী দলের কাছেও পরামর্শ আশা করি।’
প্রধানমন্ত্রী অবশ্য তাঁর ভাষণে সংসদ ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেননি। বিরোধী দল বলে আসছে, সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচনের সময় উভয় পক্ষের মধ্যে সমান সুযোগ থাকবে না। এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হবেন তিনিই। তবে বিরোধী দল আগে থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বিরোধী দলকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ‘আপনারা কী চান, তা সংসদে এসে বলুন। আলোচনা করুন। আলোচনার দরজা সব সময় উন্মুক্ত আছে।’ বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাব দেওয়ার পর তা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একবার বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আরেকবার নির্দলীয়, আবার বলছেন হাসিনামুক্ত। নানা অবাস্তব কথা বলে যাচ্ছেন। মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন। প্রয়োজনে জাতীয় সংসদে আবারও মুলতবি প্রস্তাব দিন এবং সুস্পষ্টভাবে বলুন, আপনারা কী চান।’
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘বোমা মেরে, আগুন জ্বালিয়ে জনগণের জানমালের ক্ষতি করবেন না। কোরআন শরিফ পুড়িয়ে, মসজিদে আগুন দিয়ে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করা বন্ধ করুন। মাদ্রাসায় বোমা তৈরির কাজে ব্যবহার করতে এতিম বাচ্চাদের লাশ বানানো বন্ধ করুন। নিরীহ পথচারী আর গরিব বাসচালককে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা বন্ধ করুন। মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিন।’ তিনি বলেন, ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম। ইসলাম কখনোই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের অনুমোদন দেয় না। যারা নির্দোষ মানুষকে ধর্মের নামে হত্যা করে, তাদের চূড়ান্ত ঠিকানা হবে দোজখ।
বিরোধীদলীয় নেতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছুরি, দা, খুন্তা, কুড়াল নিয়ে মানুষ মারার নির্দেশ প্রত্যাহার করুন। শান্তি ও ঐক্যের পথই দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। জনতার ওপর আস্থা রাখুন, সন্ত্রাসের পথ পরিহার করুন।’
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান নির্বাচন কমিশন গঠন করার আগে সব রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিলেন। বিরোধী দলের নেতা সেই সংলাপে যোগ দিয়েছিলেন। সবার পরামর্শক্রমেই দেশে প্রথমবারের মতো অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, সরকার গঠনের পর এ পর্যন্ত পাঁচ হাজার ৭৭৭টি নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করেছে। কোনো নির্বাচনেই সরকার হস্তক্ষেপ করেনি। অনেক নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনও অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। তিনি বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতাকে আমি সংলাপে ডেকেছিলাম। দুঃখের বিষয়, তার জবাবে তিনি আলটিমেটাম দিয়ে বললেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশছাড়া করবেন। ৪, ৫ ও ৬ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরের ধ্বংসযজ্ঞ জাতিকে আতঙ্কিত করেছিল। আমরা সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়ে মানুষের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছি, নিরাপত্তা দিয়েছি।’
শেখ হাসিনা গত সাড়ে চার বছরে তাঁর সরকারের উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে বলেন, কঠোর হাতে জঙ্গিবাদ দমন করা হয়েছে। দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণ হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়েছে। সমুদ্র বিজয় হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপর ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ১১ ভাগ থেকে কমিয়ে ৭-৮ ভাগে নামিয়ে আনা হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড অতিক্রম করে বর্তমানে ১৬ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার হয়েছে। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন নয় হাজার ৭১৩ মেগাওয়াট। ছাত্রছাত্রীরা এখন বিনা মূল্যে বই পাচ্ছে। প্রাথমিক থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত এক কোটি ১৯ লাখ ছাত্রছাত্রীকে বৃত্তি ও উপবৃত্তি দেওয়া শুরু হয়েছে। বেতন-ভাতাসহ চাকরির বয়সসীমা বাড়ানো হয়েছে।
শেখ হাসিনা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের কথা আবেগতাড়িত কণ্ঠে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাঁর ছোট ভাই শেখ রাসেলের জন্মদিন আজ (শুক্রবার)। তিনি তাঁর জন্য সবার কাছে দোয়া কামনা করেন।