সর্বনিম্ন মজুরি পোশাকশিল্পে

দেশের উল্লেখযোগ্য ১০টি শিল্প খাতের মধ্যে পোশাকশ্রমিকের মজুরিই সবচেয়ে কম। অথচ পোশাক খাতই দেশের সবচেয়ে ব্যবসাসফল শিল্প খাত। এই শিল্প থেকেই দেশের ৭৮ ভাগ রপ্তানি আয় হয়।

বাংলাদেশ বিশ্বে পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায়ও বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি সর্বনিম্ন।

বিদেশি বড় ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের মজুরি সম্পর্কে জানেন। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে তাঁরা উৎপাদন খরচের ওপর ভিত্তি করেই পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন। এ খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মজুরি বাড়লে এই ক্রেতারাও তাঁদের পণ্যের মূল্য বাড়াবেন। সম্প্রতি সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের নিরাপত্তা, মজুরি ও জীবনযাত্রার নিম্নমানের বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে।

এ অবস্থায় সরকার গত জুনে পোশাক খাতের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়সহ আনুষঙ্গিক বিষয় চুলচেরা বিশ্লেষণ করে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে আট হাজার ১১৪ টাকা নিম্নতম মজুরির দাবি করা হয়েছে। কিন্তু পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ মাত্র ৬০০ টাকা বৃদ্ধি করে তিন হাজার ৬০০ টাকা বেতন দিতে চাইছে।

২০১০ থেকে ১২ সালের মধ্যে গঠিত বিভিন্ন ন্যূনতম মজুরি বোর্ডে ঘোষিত মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, বর্তমানে নির্মাণশিল্প ও কাঠের কাজ করেন এমন শ্রমিকের নিম্নতম মজুরি নয় হাজার ৮৮২ টাকা। ট্যানারি শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরি নয় হাজার ৩০০ টাকা। তেল মিলের শ্রমিকের মজুরি সর্বনিম্ন সাত হাজার ৪২০ টাকা। ব্যক্তিমালিকানাধীন সড়ক পরিবহনে ছয় হাজার ৩০০ টাকা, রি-রোলিং মিলে ছয় হাজার ১০০ টাকা, কোল্ড স্টোরেজে ছয় হাজার ৫০ টাকা, গ্লাস অ্যান্ড সিলিকেটস কারখানায় পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারিত আছে।

এমনকি ধান ভাঙানোর চাতালে আধা দক্ষ শ্রমিকের মজুরিও এখন সাত হাজার ১৪০ টাকা। সল্ট (লবণ) ক্রাশিং শিল্পে মজুরি ঘণ্টায় ২৬৫ টাকা। কিন্তু পোশাকশিল্পে মজুরি হচ্ছে মাত্র তিন হাজার টাকা।

প্রতিযোগী দেশের তুলনায়ও কম: এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পোশাকশ্রমিকের মজুরিও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। যদিও এদের মধ্যে চীন ছাড়া সব দেশ থেকেই বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে এগিয়ে আছে। আমেরিকার ওয়ার্কার রাইটস কনসোর্টিয়ামের ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে ২০১১ সালভিত্তিক বিভিন্ন দেশের পোশাকশ্রমিকের মাসিক মজুরির হিসাব তুলে ধররা হয়েছে। তাতে বিশ্বের দ্বিতীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকের মজুরি দেখানো হয়েছে ৫২ মার্কিন ডলার। আর বিশ্বের ১ নম্বর রপ্তানিকারক দেশ চীনের মজুরি ২২৩ ডলার। এ ছাড়া কম্বোডিয়া ও ভারতে ৭০ ডলার, ইন্দোনেশিয়াতে ১১৪ ডলার, ভিয়েতনামে ১০৯ ডলার, ফিলিপাইনে ১৭৫ ডলার, থাইল্যান্ডে ২২১ ডলার মজুরি পান পোশাকশ্রমিকেরা।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিয়েতনামের সমাজতান্ত্রিক সরকার শ্রমিকের জন্য খুবই সস্তায় আবাসন, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধাও দিয়ে থাকে। এই দেশটি এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিযোগী দেশ।

রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩২ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু আর তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিকের প্রাণহানির পর বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এখানে ধারাবাহিক শ্রমিক অসন্তোষের মূলে রয়েছে কম মজুরি। এ কারণে গোটা পোশাক খাতের ভবিষ্যৎই ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

মজুরি বোর্ডে প্রস্তাব ও অসন্তোষ: বিজিএমইএ মাত্র ৬০০ টাকা শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে চাইছে। এই প্রস্তাবকে অযৌক্তিক ও অমানবিক বলেছেন মজুরি বোর্ডের দুই সদস্য—শ্রমিকনেতা ফজলুল হক ও সিরাজুল ইসলাম। মজুরি বোর্ডের সভায় এই প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন তাঁরা।

বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, বলা হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার পোশাক রপ্তানিতে উদীয়মান দেশ। সেখানেও মালিকেরা শ্রমিকদের সাড়ে চার হাজার টাকার বেশি সর্বনিম্ন মজুরি দেয়। তিনি বলেন, ‘আট হাজার ১১৪ টাকা সর্বনিম্ন মজুরি শ্রমিকদের জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা বলেছি, এটা না হলে শ্রমিকেরা বেঁচে থাকতে পারবে না।’

বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, গত এক বছরে পোশাক উৎপাদনের খরচ, উৎস কর, পরিষেবা ব্যয় বেড়েছে। আবার রানা প্লাজা ধসের পর কারখানার পরিবেশ সম্পর্কিত (কমপ্লায়েন্স) শর্ত মানতে অর্থ খরচ হচ্ছে। আবার গত বছরের চেয়ে এবার গড়ে ৩ শতাংশ কম দামে ক্রেতারা রপ্তানিকাজ দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কারখানাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি। এদের ২০ শতাংশের বেশি মজুরি বাড়ানোর ক্ষমতা নেই।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) পোশাক খাতে উৎপাদনশীলতার ওপর নমুনা জরিপ করেছে। তাতে বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আমেরিকার দেওয়া কোটা ২০০৫ সালে উঠে যাওয়ার পর কারখানা পর্যায়ে পণ্য উৎপাদনে ব্যাপক উন্নতির তথ্য পাওয়া গেছে।

সিপিডি দেখেছে, লাইনপ্রতি শ্রমিকের ব্যবহার কমেছে। মেশিন-শ্রমিক অনুপাত কমেছে। ঘণ্টাপ্রতি শ্রমিকের উৎপাদন বেড়েছে। কাঁচামাল বিশেষত কাপড় ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়া গেছে।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এ প্রসঙ্গে বলেন, এই জরিপে দেখা গেছে, সার্বিকভাবে পোশাক কারখানায় দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, ২০১০ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই দক্ষতার সমন্বয় তেমন হয়নি।

শ্রমিকদের জীবন কেমন চলছে: বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) সম্প্রতি করা এক জরিপে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ঢাকা শহরে সাদামাটা জীবন যাপন করতে চার সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের মাসে কমপক্ষে ১২ হাজার টাকার প্রয়োজন। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে কোনোরকমে টিকে থাকতে শ্রমিক পরিবারকে খরচ করতে হচ্ছে যথাক্রমে ১৩ হাজার ২৪০, ১৩ হাজার ৪৮১ ও ১১ হাজার ১১১ টাকা।

জরিপে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় একজন পোশাকশ্রমিকের মাসে কমপক্ষে পাঁচ হাজার ২২ টাকা লাগে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে দরকার হয় যথাক্রমে চার হাজার ৮৯৮, পাঁচ হাজার ১১৩ ও চার হাজার ৮২৯ টাকা।

জরিপে শ্রমিকদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, কত টাকা হলে তাঁরা মোটামুটিভাবে জীবন যাপন করতে পারবেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ঢাকায় চার সদস্যের পরিবারের জন্য প্রয়োজন ১৯ হাজার ৭৩৫ টাকা। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে প্রয়োজন যথাক্রমে ১৯ হাজার ৫৩৫, ২০ হাজার ৩৪ ও ১৮ হাজার ৭০১ টাকা।

একইভাবে ঢাকার একজন শ্রমিকের জন্য ১০ হাজর ৭৪৯, গাজীপুরে নয় হাজার ৮৩৩, নারায়ণগঞ্জে ১১ হাজার ২৩২ ও চট্টগ্রামে নয় হাজার ৬৮৯ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন জরিপে অংশ নেওয়া শ্রমিকেরা।