পাঁচ হত্যা মামলা

সর্বোচ্চ শাস্তির মামলা যাচ্ছে ‘স্বস্তির ধারায়’

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান আবদার করেছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর তা পূরণ করছেন। দুই মন্ত্রীর সৌহার্দ্যের খেলায় বিচারবঞ্চিত হচ্ছেন স্বজনহারা ব্যক্তিরা।
পাঁচটি মামলা দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা থেকে ৩০৪ ধারায় স্থানান্তরসহ আট দাবি নিয়ে গত ১৮ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। এসব মামলার আসামিরা বাস-ট্রাকের চালক ও হেলপার (সহকারী)। দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি টেবিলে রেখে সরকারের এই মন্ত্রী দর-কষাকষিতে নেমেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো রকম তদন্ত না করেই তাৎক্ষণিক সে দাবি মেনে নেন।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩০২ ধারার ওই মামলাগুলোর মধ্যে পুলিশের দুই  সার্জেন্ট হত্যাসহ পিটিয়ে হত্যার মামলাও আছে। এর মধ্যে মেহেরপুরে একজনকে পিটিয়ে হত্যা, কিশোরগঞ্জে ঝগড়ার জের ধরে একজন শিক্ষককে বাসচাপা দিয়ে হত্যার মামলাও আছে। সব কটি মামলায় পুলিশ তদন্ত শেষে হত্যার অভিযোগ এনে ৩০২ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে।
নৌ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই সভার কার্যবিবরণী ইতিমধ্যেই পরিবহন নেতাদের কাছে পৌঁছে গেছে। তাতে সরাসরি ৩০২ ধারায় মামলা না নেওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহত হলে এখন থেকে ৩০৪ ধারায় মামলা করা হবে। কিন্তু নৌমন্ত্রীর নিজ এলাকা মাদারীপুরে ৩০৪ ধারায় নেওয়া দুর্ঘটনার একটি মামলা পুলিশ তদন্ত করে হত্যার অভিযোগ এনে ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দিয়েছিল। এখন সেটিও আগের ধারায় স্থানান্তরের উদ্যোগ চলছে।
দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। ৩০৪ ধারায় সর্বোচ্চ সাজা ১০ বছর। নৌমন্ত্রী দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারার কথা বললেও তাঁর সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, মামলাগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে ৩০৪(খ) ধারায়। এ ধারায় শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছর। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক আইনজীবী বলেছেন, ৩০২ ধারার তুলনায় বাকি দুটি ধারা আসামির জন্য তুলনামূলক স্বস্তির।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুর্ঘটনায় ৩০৪(খ) ধারায় যে মামলাগুলো হওয়ার কথা, সেগুলো হয়েছে ৩০২ ধারায়। এসব মামলায় ইচ্ছাকৃতভাবে চালকদের খুনি বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা ওই মামলাগুলোর ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। খুলনার একটি মামলা জজকোর্ট ৩০২ ধারা থেকে ৩০৪(খ) ধারায় নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্য মামলাগুলো পুনরায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সুপারিশ করেছি।’

মেহেরপুরে পিটিয়ে হত্যা: মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি একটি ট্রাক অতিরিক্ত কাঠ বোঝাই করে যাওয়ার সময় কাঠের গুঁড়িতে আটকে মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী ইউনিয়নের শিবপুর ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রয়াত মোজাম্মেল শেখের বাড়ির বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে যায় এবং মিটার ভেঙে যায়। মোজাম্মেল শেখের ছেলে আজিবুর শেখ ওরফে রাজু এর প্রতিবাদ করেন। পরে রাজু ইটভাটায় গিয়ে সেই ট্রাক আটকান। একপর্যায়ে ট্রাকের চালক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলে রাজুকে ট্রাকে তুলে তাঁর বাড়ির দিকে রওনা হন। কিন্তু ট্রাকের মধ্যে চালক ও হেলপার মিলে রাজুকে মারধর শুরু করলে তিনি ট্রাক থেকে লাফিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে চালক ও হেলপার লোহার রড দিয়ে রাজুর মাথায় ও নিম্নাঙ্গে আঘাত করে তাঁকে মেরে ফেলেন। পরে তাঁরা রাজুর লাশ মোনাখালী মাঠে ফেলে যান।

রাজুর মরদেহ মোনাখালী মাঠ থেকে উদ্ধার করে পরদিন থানায় হত্যা মামলা করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মুজিবনগর থানার উপপরিদর্শক কুবাদ আলী চালক ও হেলপারকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছেন। কিন্তু ঘটনার পর থেকেই আসামিরা পলাতক।

রাজুর বড় ভাই রুহুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাইকি টিরাকির মধ্যি তুলি ডাইবার, হিলপার দুজনি পিটিয়ি মেরি ফেলিছে। একুন সেই মামলা হত্যা আইনি বিচার না করলি, আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করবু।’

রুহুল কুদ্দুস দাবি করেন, আপস করার জন্য আসামিদের পক্ষ থেকে বহুবার অনেক টাকাপয়সা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর পরিবার ওই হত্যার বিচার চায়।

কিশোরগঞ্জে শিক্ষককে বাসচাপা দিয়ে হত্যা: কিশোরগঞ্জ শহরের নিউ টাউন এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন শরীরচর্চার শিক্ষক শামসুল ইসলাম। তিনি প্রতিদিন বাসে ১০ কিলোমিটার দূরের করিমগঞ্জ উপজেলার পটুয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ে যাতায়াত করতেন।

মামলার বিবরণে দেখা যায়, একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে সিটে বসা নিয়ে এনভয় এন্টারপ্রাইজের একটি বাসের চালক ও সহকারীর সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। ওই শিক্ষককে আর ওঁদের বাসে না উঠতে শাসান চালক আবুল মনসুর ও তাঁর সহকারী শয়ন চন্দ্র। এর পর থেকে শিক্ষক শামসুল ইসলাম বাসে চলাচল বন্ধ করে দেন। একটি বাইসাইকেল কিনে কয়েক দিন পর থেকে তিনি তা চালিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল সকাল পৌনে নয়টায় সাইকেলযোগে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে কিশোরগঞ্জ-চামড়াবন্দর সড়কের শতাল এলাকায় আবদুল্লাহর মসলার মিলের সামনে পৌঁছালে চামড়াঘাটগামী এনভয় এন্টারপ্রাইজের ওই বাসটি পেছন দিক থেকে শামসুল ইসলামকে চাপা দিয়ে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। ওই গাড়ির চালক ছিলেন সেই আবুল মনসুর ও হেলপার শয়ন চন্দ্র দেব, যাঁদের সঙ্গে ওই শিক্ষকের ঝগড়া হয়েছিল।

পরদিন ১১ এপ্রিল নিহতের বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে বাসের চালক ও হেলপারকে আসামি করে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন।

থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) সালাহউদ্দিন তদন্ত শেষে আবুল মনসুর ও শয়ন চন্দ্রকে অভিযুক্ত করে ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পরে জেলা জজ আদালত থেকে মনসুর ২০১১ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। শয়ন চন্দ্র ঘটনার পর থেকেই পলাতক। মামলাটির বিচার চলছে।

খুলনায় ট্রাক থেকে ফেলে সার্জেন্ট হত্যা: খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের নিরালা এলাকায় ট্রাক থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সার্জেন্ট মনিরুজ্জামানকে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ১ জুলাই বেলা ১১টায় মনিরুজ্জামান নগরের নিরালা মোড়ে একটি ট্রাককে থামার সংকেত দেন। ট্রাকটি থামলে তিনি চালকের পাশে গিয়ে কাগজপত্র দেখানোর জন্য বলেন। এ সময় চালক ট্রাকটি দ্রুত চালিয়ে নিতে শুরু করলে সার্জেন্ট মনিরুজ্জামান চালকের দরজা ধরে ঝুলে ট্রাকটিতে ওঠার চেষ্টা করেন। চালক তাঁকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে নিরালা তাবলিগ মসজিদের সামনে সজোরে ব্রেক কষেন চালক। তাতে মনিরুজ্জামান ছিটকে দূরে গিয়ে রাস্তার ওপর পড়ে যান।

গুরুতর আহত মনিরুজ্জামানকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওই দিনই রাত আটটায় তিনি মারা যান।

পরে ট্রাফিক সার্জেন্ট আবুল বাশার বাদী হয়ে খুলনা থানায় হত্যা মামলা করেন।

নিহত মনিরুজ্জামানের বাবা আবদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আমি দুবার স্ট্রোক করেছি। আসামিরা আমাকে টাকা দিতে চেয়েছেন। নিইনি। এখন শুনছি, মামলাটি ৩০৪ ধারায় নেওয়া হচ্ছে। সরকার যদি এর ন্যায়বিচার না করে, আল্লাহ এর ন্যায়বিচার করবে। আর কী বলব।’

গাজীপুরে ট্রাকচাপা দিয়ে সার্জেন্টকে হত্যা: ২০১০ সালের ৭ আগস্ট গাজীপুরে ট্রাফিক সার্জেন্ট মোহাম্মদ সোহেল রহমান বাদী হয়ে জয়দেবপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, সার্জেন্ট মো. বেল্লাল হোসেন ওই দিন গাজীপুর সদর উপজেলার ভোগড়া মোড় থেকে ২০০ গজ পূর্বে কাঁচাবাজারের সামনে মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সকাল পৌনে সাতটায় ফাঁকা মহাসড়কে টাঙ্গাইলগামী একটি ট্রাকের অজ্ঞাতনামা চালক সার্জেন্ট বেল্লাল হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে চাপা দেন। ট্রাকের ধাক্কায় তিনি মহাসড়কের পাশে ছিটকে পড়েন। তাঁর কপালের বাঁ পাশ, বাঁ কান, চোয়াল, হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়। আশপাশের লোকজন বেল্লালকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তাঁরা ট্রাকটিও আটক করেন। পরে উদ্ধারকারীরা বেল্লালকে গাজীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বেল্লাল। সুরতহাল প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই দিনই জয়দেবপুর থানায় ৩০২ ধারায় মামলা করা হয়।

পরে জয়দেবপুর থানার উপপরিদর্শক রফিকুল ইসলাম তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। তাতে বলা হয়, ওই ট্রাকের চালক ছিলেন মো. জিয়াউর রহমান। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইলের কালিহাতী থানার পালিমা গ্রামে। এই আসামি ২০১০ সালের ৪ অক্টোবর স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

মাদারীপুর: নৌমন্ত্রীর নিজ জেলা মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার একটি মামলা প্রথমে ৩০৪ ধারায় দেওয়া হলেও পরে পুলিশ ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দেয়। এখন এ মামলাকেই আবার ৩০৪ ধারায় আনা হচ্ছে নৌমন্ত্রীর উদ্যোগে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২২ মে মাদারীপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পিকআপের চালক জেলার কালকিনি উপজেলার পুবকমলাপুর গ্রামের আলমগীর সরদার ফরিদপুর আঞ্চলিক অফিসের কাজ শেষে পিকআপে করে সহকর্মীদের সঙ্গে মাদারীপুর আসছিলেন। পথে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের কামালদী ব্রিজের পূর্ব পাশে ওয়ারিদ টেলিকম টাওয়ারের উত্তর পাশে এলে বিপরীত দিক থেকে আসা গ্লোবাল পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই আলমগীর সরদার নিহত ও অপর চারজন আহত হন।

নিহতের ভাই শাহ আলম বাদী হয়ে রাজৈর থানায় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা রাজৈর থানার উপপরিদর্শক খন্দকার শওকত জামান তথ্যপ্রাপ্ত হয়ে ঘটনাটিকে খুনের অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।

মামলার বাদী শাহ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা নয়। চালক উদ্দেশ্য নিয়েই এটা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।’ আসামি চালক মাসুদ রানা জামিন নিয়ে পলাতক।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, দুর্ঘটনার মামলা ৩০২ ধারায় নেওয়া আইনসম্মত নয়। কিন্তু যে মামলাগুলোয় তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে ৩০২ ধারায় অভিযোগপত্র দিয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু এগুলো আদালতে আছে, তাই মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মেহেরপুর প্রতিনিধি তুহিন আরন্য, কিশোরগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফুল হক মোল্লা, খুলনা অফিসেরসুমন্ত চক্রবর্ত্তী, গাজীপুর প্রতিনিধি মাসুদ রানা ও মাদারীপুরের কালকিনি প্রতিনিধি খায়রুল আলম।]