জামায়াতের হরতাল

সহিংসতায় দুজন নিহত, অগ্নিদগ্ধ ৩

টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতালের দ্বিতীয় দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার জামায়াত-শিবির ছিল সহিংস। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে তাণ্ডব চালিয়েছে। সিরাজগঞ্জের চণ্ডীদাসগাতীতে হরতাল-সমর্থকদের হামলায় এক অটোরিকশাযাত্রী নিহত হয়েছেন। মেহেরপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা গেছেন জামায়াতের এক কর্মী।

এ ছাড়া গাজীপুর সদর উপজেলার ভোগড়া এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বাসচালক অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও বগুড়ার শেরপুরে অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন দুই ট্রাকচালক।

তবে প্রথম দিনের মতো গতকালও রাজধানীতে ঢিলেঢালাভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। ধানমন্ডিতে শিবিরের হামলায় দুই বাসযাত্রী আহত হয়েছেন। পুরান ঢাকায় বেশ কিছু ককটেল ফাটানো হয়েছে।

মেহেরপুরের মুজিবনগর বন্দর গ্রামে সকালে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করেন জামায়াতের কর্মীরা। পুলিশ অবরোধ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করলে তাঁরা পুলিশের ওপর চড়াও হন। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে।

SIRAJGONJ-(PASSENGER-ASSOLT)--PHOTO-19.09প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, প্রায় একই সময় মুজিবনগর গৌরীনগর খাল মোড়েও অবরোধ সৃষ্টি করেন জামায়াতেন কর্মীরা। পুলিশ তাঁদের প্রতিরোধ করতে গেলে দুই পক্ষে সংঘর্ষ বেধে যায়। জামায়াতের কর্মীরা মুজিবনগর পুলিশের এসআই শামসুল মান্নানকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা ও পা কুপিয়ে জখম করেন। হরতালকারীদের ইটের আঘাতে ওসি রবিউল ইসলামসহ আরও চারজন আহত হন। পুলিশ পাল্টা জামায়াতের কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমিরের ছেলে আবদুল্লাহ আল নোমান (৩২) ও দারিয়াপুর গ্রামের দেলোয়ার হোসেনসহ (৩৪) পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন। গুরুতর আহত দেলোয়ারকে মেহেরপুর থেকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান। আহত পুলিশ কর্মকর্তা মান্নানকে মেহেরপুর থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। অন্যরা মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন।মেহেরপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) আবদুল জলিল বলেন, মুজিবনগরে স্বল্প জনবল নিয়ে অবরোধকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের এগিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। সেখানে পুলিশকে লক্ষ্য করে জামায়াতের কর্মীরা বৃষ্টির মতো ইট নিক্ষেপ করেন। তাঁরা এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাতে শুরু করলে পুলিশ গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গোলচত্বর থেকে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে পাঁচজন যাত্রী নিয়ে একটি অটোরিকশা সিরাজগঞ্জ শহরে যাচ্ছিল। অটোরিকশাটি সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক সড়কের সদর উপজেলার চণ্ডীদাসগাতী বেইলি ব্রিজের কাছে পৌঁছালে জামায়াতের কর্মীরা এটি লক্ষ্য করে ইট ছুড়ে মারে এবং লাঠিসোঁটা দিয়ে আঘাত করেন। এতে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে অটোরিকশাটি রাস্তার পাশে পড়ে যায়। পরে জামায়াতের কর্মীরা সেখানে গিয়ে অটোরিকশাটি ভাঙচুর এবং যাত্রীদের মারধর করেন। এতে যাত্রী মাসুদ আলী ও শাহ আলম গুরুতর আহত হন। পুলিশ আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাসুদ আলী বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মারা যান। তিনি রায়গঞ্জ উপজেলার দেওভোগ গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে।

এদিকে হরতাল-সমর্থকেরা সকালে বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কের কামারখন্দ উপজেলার কাশেম মোড়, বানিয়াগাতী ও নলকায় গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করলে পুলিশ শটগানের গুলি, রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গাজীপুর শহর থেকে সকাল নয়টার দিকে ভিআইপি-২৭ নামের একটি যাত্রীবাহী বাস ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল। পথে চান্দনা চৌরাস্তা বাসস্ট্যান্ড থেকে শিবিরের কয়েকজন কর্মী যাত্রীবেশে বাসে ওঠেন। বাসটি ভোগড়া এলাকার বর্ষা সিনেমা হলের সামনে পৌঁছলে তাঁরা কেরোসিন ও পেট্রল ঢেলে বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। এতে বাসচালক নজরুল ইসলামের (৪০) শরীরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বাসটি থামিয়ে দ্রুত নেমে পড়েন। পরে আশপাশের লোকজন তাঁর গায়ের আগুন নেভান। অগ্নিসংযোগের পর বাস থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ১০ জন যাত্রী আহত হন। অগ্নিদগ্ধ চালককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি গাজীপুর সদর উপজেলার হায়দরাবাদ এলাকায়।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে ডিএমসি পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজামেঞ্চল হক জানান, বাসচালক নজরুলের শরীরের ৬৫ ভাগ পুড়ে গেছে।

এদিকে বেলা দেড়টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর সদর উপজেলার বোর্ডবাজার এলাকায় ১০-১২ জন শিবিরের কর্মী ককটেল ফাটান এবং বেশ কয়েকটি যানবাহন ভাঙচুর করেন। এ সময় স্থানীয় ব্যক্তিরা শিবিরের আট কর্মীকে আটক করে গণপিটুনি দেন। খবর পেয়ে জয়দেবপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে গাজীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করায়। এ সময় আহত শিবিরের কর্মীদের কাছ থেকে একটি তাজা ককটেল, গান পাউডার, কেরোসিন ও পেট্রলের বোতল উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আমজাদের বাজার মাদ্রাসার সামনে বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি চলন্ত ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেন জামায়াতের কর্মীরা। এতে তাৎক্ষণিক ট্রাকের সম্মুখভাগে আগুন ধরে গেলে ট্রাকচালক সিকান্দার আলী (৫০) অগ্নিদগ্ধ হন। পুলিশ ও দমকলকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিভিয়ে সিকান্দারকে উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের শেরপুরের দশমাইল এলাকায় রাত পৌনে ১০টার দিকে একটি চলন্ত ট্রাকে পেট্রল বোমা ছুড়ে মারে হরতাল-সমর্থকেরা। এতে ট্রাকে আগুন লেগে ট্রাকচালক শামছুল হক (৫০) ও তাঁর সহকারী মো. শাহীন (২২) অগ্নিদগ্ধ হন। গুরুতর আহত শামছুল হককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মো. শাহীন বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শেরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সোহেল রানা জানান, ট্রাকচালক শামছুল হকের শরীরের ৮০ ভাগ পুড়ে গেছে। শাহীনের পুড়ে গেছে হাত ও পিঠ।

এ ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান শেরপুর থানার ওসি আমিনুল ইসলাম।

ফজরের নামাজের পরপরই হরতালের সমর্থনে বরিশাল নগরের সিঅ্যান্ডবি রোড এলাকায় মিছিল বের করে জামায়াত। মিছিলকারীরা হঠাৎ সিঅ্যান্ডবি সড়কের এক নম্বর সেতুর কাছাকাছি সিটি বাস ডিপোতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় পুলিশ ধাওয়া করে ফাঁকা গুলি ছুড়লে তারা পালিয়ে যায়। অনেকে পার্শ্ববর্তী পুকুরে ঝাঁপ দেয়। সেখান থেকে তিনজনকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক মো. আশরাফুল আলম নাশকতার অভিযোগে ওই তিনজনকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। তাঁরা হলেন আবদুল্লাহ আল জাফর (১৯), মো. রেজাউল (২২) ও মো. সানাউল্লাহ (২২)।

রাজধানীতে হরতাল: ধানমন্ডির ১৫ নম্বর সড়কে সকাল সোয়া নয়টায় শিবিরের কর্মীদের যানবাহন ভাঙচুরের সময় আহত হন দুদকের উপপরিচালক মীর জয়নাল আবেদীন ও মফিদুল ইসলাম। শিবিরের কর্মীদের ছোড়া ইটের আঘাতে তাঁদের বাসের জানালার কাচ ভেঙে যায়। ভাঙা কাচে মফিদুলের হাত কেটে যায় এবং জয়নাল মাথায় আঘাত পান। জয়নাল হল-মার্কের অর্থ কেলেঙ্কারি মামলা তদন্ত করছেন।

বেলা আড়াইটার দিকে পুরান ঢাকার বাংলাবাজার মোড় এলাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের ব্যানারে ১০-১৫ জন কর্মী মিছিল বের করেন। মিছিলটি লালকুঠি এলাকায় যাওয়ার সময় পুলিশ ধাওয়া করে। পরে শিবিরের কর্মীরা চারটি ককটেল ফাটিয়ে পালিয়ে যান।

সকালে পুরান ঢাকার ধোলাইখাল এলাকায়ও মিছিল করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের কর্মীরা। মিছিলটি নারিন্দা এলাকায় যাওয়ার সময় পুলিশ বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে শিবিরের কর্মীরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে ও তিনটি ককটেল ফাটিয়ে পালিয়ে যায়।

গতকাল সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান দাবি করেছেন, হরতালে পুলিশের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস এবং আওয়ামী লীগের হামলায় জামায়াতের তিন শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। গ্রেপ্তার হয়েছেন পাঁচ শতাধিক।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লা; মেহেরপুর, গাজীপুর, চৌদ্দগ্রাম ও শেরপুর প্রতিনিধি।