সাংসদদের পদ লাভজনক কি না ব্যাখ্যা খুঁজছে ইসি

সাংসদদের পদ লাভজনক কি না, কিংবা তাঁরা পদে থেকে নির্বাচন করতে পারবেন কি না—এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা খুঁজছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কোনো আইনি ব্যাখ্যা থাকলে তা কমিশনের টেবিলে উত্থাপনের জন্য কমিশন সচিবালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, তাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বিষয়টির সুরাহা হওয়া দরকার। এ বিষয়ে কমিশন সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে না পারলে প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে।

কমিশন সচিবালয় সূত্র জানায়, এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের কোনো রায় বা পর্যবেক্ষণ আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যে এ-সংক্রান্ত নথি কমিশনের সভায় উপস্থাপন করা হবে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ১২ ধারায় বলা আছে, সরকারের লাভজনক পদে থাকলে কেউ সাংসদ হিসেবে প্রার্থী হতে পারবেন না। প্রজাতন্ত্র কিংবা সরকারি সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান কিংবা এমন কোনো কোম্পানি, যাতে সরকারের ৫০ শতাংশের বেশি মালিকানা রয়েছে, এমন কোম্পানিতে বেতন, সম্মানী কিংবা আর্থিক বা অন্য কোনোভাবে লাভজনক পদ বা অবস্থানকে লাভজনক পদ হিসেবে গণ্য করা হবে।

সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। অর্থাৎ সংসদ আগে ভেঙে গেলে সাংসদদের পদ লাভজনক কি না, সে প্রশ্ন উঠবে না।

তবে নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারকের মতে, সাংসদদের পদ লাভজনক। তিনি বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের পদ লাভজনক হবে না। সেখানে সাংসদদের নাম উল্লেখ নেই। সে জন্যই সাংসদদের পদ লাভজনক বলে আমি মনে করি।’

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদে থাকলে তিনি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য হবেন। তবে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না।

সংবিধান ও আইনে লাভজনক পদের যে ব্যাখ্যা দেওয়া আছে, তা নিয়ে নির্বাচন ও আইন বিশ্লেষকদের মধ্যে দুই রকম মত রয়েছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদার মতে, সাংসদদের পদ লাভজনক নয় বলেই সেটি সংবিধানে উল্লেখ করা হয়নি। আর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদ লাভজনক বলেই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে সংবিধান তাঁদের লাভজনক পদের সংজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে।

তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সাংসদদের পদ লাভজনক। কারণ, তাঁরা সরকারের কাছ থেকে বেতনভাতা পেয়ে থাকেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিষয়টি নিয়ে যাতে কোনো বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে রাখা উচিত।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিকের ব্যাখ্যা হলো, লাভজনক পদে যাঁরা থাকেন তাঁদের নির্বাহী ক্ষমতা থাকে। তাঁদের নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের। কিন্তু সাংসদদের কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই এবং তাঁদের অপসারণের ক্ষমতাও নির্বাহী বিভাগের ওপর ন্যস্ত নয়। তাই সাংসদদের পদকে লাভজনক বলা যাবে না।

জেলা পরিষদের প্রশাসক: জেলা পরিষদের প্রশাসকেরা দায়িত্বে থেকে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আরপিও অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা অবসর নেওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। প্রশ্ন উঠেছে, জেলা পরিষদের প্রশাসকেরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী কি না? কারণ, সরকার তাঁদের নিয়োগ দিয়েছে। তাঁরা সরকারের কাছ থেকে সম্মানীও পেয়ে থাকেন। দলীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া এসব প্রশাসকের অনেকেই আসন্ন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। তাই কমিশন এ বিষয়টিরও আইনি ব্যাখ্যা খুঁজছে।

প্রসঙ্গত, তিন পার্বত্য জেলা বাদে বাকি ৬১ জেলা পরিষদে সরকার ২০১১ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রশাসক নিয়োগ দেয়। র প্রশাসক নিয়োগ দেয়।