সাকার আইনজীবীর সহকারীসহ শনাক্ত

সাহাদাত হোসেন পরশ/আতাউর রহমান
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (সাকা) ফাঁসির রায়ের খসড়া ফাঁস হওয়ার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের দুই কর্মচারী নয়ন আলী ও ফারুক হোসেনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে ফারুককে গ্রেফতারের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি পুলিশ। এ ছাড়া চূড়ান্ত রায়ের আগেই খসড়া ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের সহকারী অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসানকে শনাক্ত করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, মেহেদী পলাতক। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ডিবির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, মেহেদী মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন ও ব্ল্যাকমেইল করে ট্রাইব্যুনালের ওই দুই কর্মচারীকে ব্যবহার করে রায়ের খসড়া কপি ফাঁস করেছেন। ফারুক ট্রাইব্যুনালের স্টেনোগ্রাফার ও নয়ন আলী মাস্টাররোলে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কম্পিউটার পরিচালনায় দক্ষ হওয়ায় নয়ন আলী ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার শাখায়ও মাঝে মধ্যে কাজ করতেন। এ সুযোগে নয়ন পেনড্রাইভে মেহেদী হাসানের কাছে অর্থের বিনিময়ে রায়ের খসড়া কপি তুলে দেন। রায় যখন ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কম্পোজ করা হচ্ছিল, তখন নয়ন আলী পেনড্রাইভে সেটির খসড়া অংশ সাকার আইনজীবীর সহকারীকে সরবরাহ করেন। এদিকে
রায়ের খসড়া ফাঁস হওয়ার ঘটনায় গতকাল তথ্যপ্রযুক্তি আইনে শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় মেহেদী হাসান, ফারুক ও নয়ন আলীকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেফতারদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজ রিমান্ড আবেদন করা হতে পারে। মামলায় অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
গতকাল সাকার আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়েছে ডিবি। সেখান থেকে ডিবি কম্পিউটারের দুটি সিপিইউ, একটি প্রিন্টার ও ৫০-৬০টি সিডি জব্দ করে।
গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের সহকারী মেহেদী হাসান রায়ের খসড়া ফাঁসের অন্যতম হোতা। ওই আইনজীবীর অফিসে অভিযান চালিয়ে জব্দ করা কম্পিউটার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর সঙ্গে আরও কারা জড়িত তা তদন্ত করা হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর পর সাকা চৌধুরীর স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা একটি নথি সাংবাদিকদের দেখিয়ে দাবি করেন, আগের রাত থেকেই বিভিন্ন ওয়েবসাইটে রায়ের অনুলিপি পাওয়া যাচ্ছে। সেটি আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া গেছে বলা হয়েছে। বুধবার ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার ও মুখপাত্র একেএম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে ট্রাইব্যুনাল অনুমান করছেন, সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায়ের খসড়ার কিছু অংশ ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে ফাঁস হয়েছে। ওই দিনই শাহবাগ থানায় জিডি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার একেএম নাসিরউদ্দিন মাহমুদ। এরপর চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটির অনুসন্ধান শুরু করে ডিবি। অনুসন্ধানে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই প্রমাণ মিলল_ ট্রাইব্যুনাল থেকেই রায়ের খসড়া কপি ফাঁস হয়েছে।
গতকাল রাতে ডিবি ট্রাইব্যুনালের কর্মচারী নয়ন আলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এ সময় ডিবির কর্মকর্তাদের কাছে নয়ন স্বীকার করেন_ গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে রায়ের খসড়া কপি তিনি অ্যাডভোকেট মেহেদীর কাছে হস্তান্তর করেন। তিনি পেনড্রাইভের মাধ্যমে এই কপি সরবরাহ করেছেন। অন্তত তিন দফায় রায়ের খসড়া কপির বিভিন্ন অংশ সরবরাহ করার কথা স্বীকার করেছেন নয়ন। এমনকি রায়ের খসড়া সাকার আইনজীবীর কাছে সরবরাহ করতে আর্থিক লেনদেন হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তবে কত টাকা সাকার আইনজীবীর কাছ থেকে নিয়েছেন_ সে ব্যাপারে পুরোপুরি মুখ খোলেননি নয়ন আলী। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, পেনড্রাইভের মাধ্যমে রায়ের কপি হাতে পাওয়ার পর তা যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেই তা ওয়েবসাইটে দেওয়া হতে পারে। তবে রায়ের খসড়া কপি কোন কম্পিউটার থেকে ওয়েবসাইটে আপলোড হয়েছে_ তা নিয়ে আরও পরীক্ষা চলছে। গোয়েন্দারা এটা নিশ্চিত হয়েছেন, যে কম্পিউটার থেকে ওয়েবসাইটে আপলোড হয়েছে, সেটিতে বাংলা ফন্ট ছিল না।
ডিবির ডিসি (দক্ষিণ) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, সাকার ফাঁসির রায়ের খসড়া ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে পেনড্রাইভের মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে, এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই কম্পিউটারটি ফখরুলের সহকারী মেহেদী হাসান ব্যবহার করতেন। রায়ের খসড়া ফাঁসের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত থাকতে পারেন। তাদেরও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
যেভাবে ফাঁস :জিডির অনুসন্ধানের সঙ্গে ডিবির একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, ট্রাইব্যুনালের স্টেনোগ্রাফার ফারুক হোসেনের মাধ্যমে নয়ন আলীর সঙ্গে মেহেদী হাসানের পরিচয়। ওই আইনজীবী নয়ন আলীর কাছে পিটিশন দাখিলের জন্য আদেশনামার কপি চান। এরপরই নয়ন আলী আদেশনামার কপি পেনড্রাইভে মেহেদী হাসানকে সরবরাহ করেন। তবে ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটার থেকে আদেশনামার কপির পরিবর্তে সাকার রায়ের খসড়া কপি মেহেদীর হাতে চলে যায়। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে নয়ন আলী মেহেদী হাসানের কাছে তা ফেরত চান। এরপর মেহেদী হাসান মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভন দিয়ে নয়ন আলীর কাছে আরও কয়েক দফায় রায়ের খসড়ার কপি নেন। নয়ন আলীকে মেহেদী হুমকি দিয়ে বলেন, ‘এটা বাইরে জানাজানি হলে তোর চাকরি যাবে। তুই জেলে যাবি।’ বৃহস্পতিবার রাতে নয়ন আলীকে ডিবি কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অকপটে বলেন, ‘আমার মাধ্যমে পেনড্রাইভে রায়ের খসড়া মেহেদী হাসানের কাছে যায়।’ ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বছর দেড়েক আগে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে চতুর্থ শ্রেণী পদে যোগ দেন নয়ন আলী। কম্পিউটারে দক্ষ হওয়ায় প্রায়ই ট্রাইব্যুনালের কম্পিউটারে কাজ করতেন নয়ন আলী। তার গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। ট্রাইব্যুনালে অফিস সহকারী শাখার ফারুক হোসেনের সঙ্গে নয়ন আলীর অত্যন্ত ভালো সম্পর্ক ছিল। মেহেদী হাসান এক পর্যায়ে নয়ন আলীকে অভয় দিয়ে বলেন, ‘আমরা সবাই তোর সঙ্গে আছি। তোর কোনো বিপদ হবে না। বরং তোর মাধ্যমে খসড়া ফাঁস হয়েছে, এটা জানাজানি হলে বিপদে পড়বি।’
যেভাবে খসড়া পাচার :গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, বিটিআরসির সহায়তা ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা নিশ্চিত হন, একটি মেইল আইডি থেকে ওই খসড়া ফাইলগুলো বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেফতার নয়ন আলীর দেওয়া তথ্য যাচাই করে গতকাল দুপুরে সাকা চৌধুরীর আইনজীবীর কাকরাইলের কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে ওই আইনজীবীর সহকারী মেহেদী হাসানের ব্যবহৃত কম্পিউটারসহ দুটি সিপিইউ ও কয়েকটি সিডি জব্দ করা হয়। এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চুরি হওয়া রায়ের খসড়া কপি এসব কম্পিউটারে ব্যবহার করা হয়েছে। কম্পিউটার প্রযুক্তিবিদদের সহায়তায় এগুলো আরও যাচাই করা হচ্ছে। রায়ের খসড়া ‘নকল’ হয়নি_ এটা নিশ্চিত।
একজন দায়িত্বশীল গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, তাদের ধারণা, মেহেদী হাসানের কম্পিউটার থেকেই ই-মেইলের মাধ্যমে খসড়া কপি বিদেশে পাঠানো হয়েছে। পরে যুক্তরাজ্য থেকে তা কয়েকটি ওয়েবসাইটে আপলোড করে রায় প্রকাশের আগে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মেহেদী হাসানকে গ্রেফতার করা গেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। মেহেদী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগ থেকে পাস করেছেন।
ডিবি কর্মকর্তাদের বক্তব্য :তদন্তের অগ্রগতি জানাতে গতকাল বিকেলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করেন ডিবি কর্মকর্তারা। সেখানে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত রায়ের খসড়া ফাঁসের সঙ্গে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবীর একজন সহকারী ও ট্রাইব্যুনালের দুই কর্মচারীকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। আইসিটি আইনে দায়ের করা ওই মামলায় অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিবি কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলেন, সাকা চৌধুরীর পরিবারের কেউ এ খসড়া ফাঁসের সঙ্গে জড়িত কি-না_ তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে রায়ের খসড়া ফাঁসের পর ওই পরিবারটি সুবিধাভোগী ছিল। আরও অনেকেই এ ঘটনায় সুবিধাভোগী ছিলেন। তদন্তেই সবকিছু বেরিয়ে আসবে। সাকা চৌধুরীর আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনও তার কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। মামলার প্রয়োজনে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এছাড়া ডিবি ট্রাইব্যুনাল এলাকার বেশ কয়েকটি সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছে।
ওই আইনজীবীর কার্যালয়ে অভিযান বিষয়ে ডিবির উপকমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, আদালত থেকে তল্লাশি আদেশ নিয়েই তারা ওই অফিসে গেছেন।
সাকার আইনজীবীর কার্যালয়ে অভিযান :গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে রাজধানীর ৬১, কাকরাইলের পাইওনিয়ার রোডে সাকার আইনজীবী ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলামের কার্যালয়ে অভিযান চালায় ডিবি। এ সময় ফখরুলের সহযোগী আইনজীবী মেহেদী হাসানের কক্ষ থেকে দুটি সিপিইউ, প্রিন্টার ও সিডি জব্দ করেছেন ডিবি সদস্যরা। ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কাউকে না জানিয়ে ডিবি তার কার্যালয়ে প্রবেশ করেছে। এ সময় তিনি কার্যালয়ে ছিলেন না। ৩-৪ জন কর্মচারী কার্যালয়ে ছিলেন। তবে ডিসি (ডিবি) কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে বলেন, আদালতের অনুমতি নিয়েই অভিযান চালানো হয়েছে। সেখান থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলামতও জব্দ করেছেন তারা।
এদিকে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আইনজীবী ফখরুল ইসলামের কাকরাইলের কার্যালয়ে পুলিশের তল্লাশির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, এ তল্লাশি দুরভিসন্ধিমূলক ও অন্ধ হিংসার বহিঃপ্রকাশ।
আইসিটি আইনে মামলা :সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের খসড়া ফাঁসের ঘটনায় তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তিনজনকে আসামি করে একটি মামলা করেছে পুলিশ। ডিবি ইন্সপেক্টর ফজলুর রহমান বাদী হয়ে আইসিটি আইনের ৫৪, ৫৭ ও ৬৩ ধারায় শাহবাগ থানায় ওই মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কর্মচারী নয়ন আলী, ফারুক হোসেন ও সাকা চৌধুরীর আইনজীবীর সহকারী মেহেদী হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় অজ্ঞাত কয়েকজন আসামি রয়েছে। গতকাল বিকেলে আসামি নয়ন আলীকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তা কৃষ্ণপদ রায় সমকালকে জানান, আজ নয়ন আলীকে আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে। অপর আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।