সাকা চৌধুরীর মামলার রায় লেখা চলছে

একাত্তরের মানবতা-বিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এমপির বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় রায়ের জন্য অপেক্ষার পালা শুরু হয়েছে। গত ১৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ট্রাইব্যুনাল যেকোনো দিন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন। ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারকরা রায় ঘোষণা করবেন। এখন চলছে রায় লেখা।
জানা যায়, রায় লেখা শেষ হলেই ট্রাইব্যুনাল রায়ের দিন নির্ধারণ করে তা সব পক্ষের আইনজীবীদের জানিয়ে দেবেন। রায় ঘোষণার ঠিক আগের দিন এটা জানানো হবে। এর আগে যে ছয়টি মামলায় ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছেন, সেসব মামলায় ঠিক একই নিয়মে রায় ঘোষণা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রায় কবে হবে তা নির্ধারণ করবেন ট্রাইব্যুনাল। তবে আশা করছি, শিগগিরই এ রায় হবে।’ তিনি বলেন, এর আগের সব মামলায়ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার বেশ কিছুদিন পর রায় ঘোষণা করা হয়। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনাল যত দিন প্রয়োজন তত দিন ধরে রায় লেখা সম্পন্ন করতে পারেন।
হত্যা, গণহত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট, দেশান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগ রয়েছে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে। অবশ্য রাষ্ট্রপক্ষ ১৭টি অভিযোগের পক্ষে সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছে।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র পাঁচ মাসে রাউজানসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে ৪৩৭ ব্যক্তিকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাউজানের শাকপুরা, ঊনসত্তর-পাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ করা হয়। এ ক্ষেত্রে শুধু রাউজানেই ৯টি গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। সাকা চৌধুরীর উপস্থিতি ও নির্দেশে তাঁর সহযোগীরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে এসব ঘটনা ঘটায় বলে অভিযোগ রয়েছে। মূলত হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিশ্চিহ্ন করা ও হিন্দুদের দেশান্তরে বাধ্য করার জন্যই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। সাকা চৌধুরীর চট্টগ্রামের বাসভবন ‘গুডহিল’কে টর্চার সেন্টার করা হয়। সেখানে শহরের মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নারীদের একের পর এক ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাকা চৌধুরী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য। বিএনপির কোনো নেতার বিরুদ্ধে এই প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। তবে বিএনপি নেতা হিসেবে নয়, একাত্তরে গঠিত কনভেনশন মুসলিম লীগের সদস্য হিসেবেই সাকার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তাঁর বাবা কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা সাবেক স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী।
এর আগে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, সাবেক আমির গোলাম আযম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা এবং সাবেক রুকন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর গত বছরের ৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে সাকার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে তিন শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা, পাঁচজনকে ধর্ষণে সহযোগিতা করা, ছয়টির বেশি গণহত্যাসহ ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের ৩(২)(এ), ৩(২)(সি), ৩(২)(জি) এবং ৩(২)(এইচ) ধারায় এ অভিযোগ গঠন করা হয়।
২০১০ সালের ২৬ জুন হরতালের আগের রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকায় গাড়ি ভাঙচুর ও গাড়ি পোড়ানোর একটি ঘটনায় সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের ভোরে সাকাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ১৯ ডিসেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। দিন কয়েক পর ৩০ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের মতো সাকা চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।
২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৫টি মানবতাবিরোধী অপরাধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) জমা দেওয়া হয়। এরপর ১৮ নভেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। তবে ট্রাইব্যুনাল ২৩টি অভিযোগ গঠন করেন। এরপর এ মামলায় গত বছরের ১৪ মে থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ বছর ২৮ জুলাই পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ চলে। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ৪১ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এ ছাড়া চারজন সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তা সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন ট্রাইব্যুনাল। সাকা চৌধুরীর পক্ষে সাফাই সাক্ষী হিসেবে নিজেসহ চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। গত ২৮ জুলাই থেকে এ মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সাকার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবীরা।