সাগরে উদ্ধারে অটল নাবিকেরা

sagor

উত্তাল সাগরে ভেসে বেড়ান একদল নাবিক। সতর্ক চোখ খোঁজেন সাগরে ভেসে থাকা অসহায় অভিবাসীদের। বিপন্ন মানুষের আর্তনাদ শুনতে খাঁড়া থাকে কান। পচা লাশের গন্ধ নাকে আসতেই টানটান হয়ে ওঠে শরীর। এভাবে কেটে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। তাঁদের হাতে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার হয় হাজার হাজার অভিবাসী। কখনো জীবিত, কখনোবা মৃত।
অভিবাসীদের বেশির ভাগ আসেন আফ্রিকা বা লিবিয়া থেকে। ভাগ্যান্বেষণের আশায় ভাঙাচোরা ডিঙি নৌকায় করে পাড়ি দেন উত্তাল ভূমধ্যসাগর। কখনো তাঁদের পাওয়া যায় ইতালির উপকূলে। কখনোবা স্পেনে। কখনোবা লিবিয়ার উপকূলে। তাঁদের উদ্ধার করতে সাগরে ভেসে বেড়ান একদল নাবিক।
ফ্রান্সের নৌবাহিনীর এমনই একটি টহল নৌকা কমান্ড্যান্ট বিরো। ৯০ জন নাবিক নিয়ে সেই নৌকায় অভিবাসীদের রক্ষা করার দায়িত্ব পালন করছেন লেফটেন্যান্ট পিয়েরে অ্যান্টনি।
এএফপিটিভিকে অ্যান্টনি বলেন, এই কাজের জন্য মনটাকে শক্ত রাখতে হয়। কারণ প্রতিনিয়ত ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। সাগরে ভেসে থাকা পচাগলা লাশ উদ্ধার করতে হয় তাঁদের। এর মধ্যে অনেক সময় জীবিত মানুষকেও খুঁজে পাওয়া যায়।

থাকে সংক্রমণের ভয়ও। অভিবাসীরা বিভিন্ন জায়গা থেকে আসেন। সবাইকে আশ্রয় দিতে হয় নৌকায়। ইবোলাসহ অন্য কোনো রোগের সংক্রমণ যাতে না হয়, এ জন্য নাবিকদের সতর্ক থাকতে হয়। যত্নে রাখতে হয় অভিবাসীদের।

নৌকায় বিপন্ন অভিবাসীরা আর্তনাদ করতে থাকেন। তাঁদের অনেকেই অসুস্থ। নৌকায় দায়িত্বরত চিকিৎসক মগরান বলেন, সাগরে থাকতে থাকতে অভিবাসীরা অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়েন। তাঁদের পানিশূন্যতা দেখা দেয়। এ সময় নৌকায় একধরনের বিপর্যয় ঘটে।

২৭ এপ্রিল থেকে উত্তর আফ্রিকায় টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে বিরো। আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ভূমধ্যসাগর থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার করছেন তাঁরা। যখনই সাগরে ভাসতে থাকা কোনো নৌকা থেকে সংকেত আসে, সতর্ক হয়ে ওঠেন বিরোর নাবিকেরা।

উদ্ধারকারী এক কর্মকর্তা রোমারিক বলেন, একদিন ঝড়ের সময় তাঁরা তিউনিসিয়ার উপকূলে ছিলেন। এ সময় সেখানে থাকা একটি ভাঙাচোরো নৌকা থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার করেন। এতে তাঁরা কিছুটা অবাক হন। কারণ এই এলাকায় সাধারণত অভিবাসীদের পাওয়া যায় না। সেখানে হঠাৎ করেই অভিবাসীদের পেয়ে তাঁরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন।

২ মে সকালে উদ্ধারকাজে সাহায্য করার জন্য কয়েকটি ইতালীয় নৌকা পাঠানো হয়। বিরোর নাবিকেরা ওই দিন বেশ কয়েকটি নৌকা থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার করেন। বিরোর প্রধান প্রকৌশলী বেনোত বলেন, ৭৫ জন আরোহী নিয়ে প্রথম নৌকাটি ভেড়ে। নৌকায় পানি উঠেছিল। আরোহীরা প্রাণপণে সেই পানি সরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন।

লিবিয়ার উপকূল থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে নৌকাটি ভাসতে দেখা যায়। নৌকায় কেবল এক দিনের খাবার ছিল। তাঁদের কাছে পানিও ছিল না। নৌকায় জ্বালানিও শেষ হয়ে গিয়েছিল। ওই দিন সাড়ে তিন হাজার অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের ইতালি পৌঁছে দেওয়া হয়।

অভিবাসীদের তুলে নেওয়ার পর নৌকাগুলোকে ডুবিয়ে দেন বিরোর নাবিকেরা, যাতে মানব পাচারকারীরা পরে আর সেগুলো ব্যবহার করতে না পারে। বিরোতে একজন সেবিকাও রয়েছেন। তিনি অসুস্থ অভিবাসীদের সেবা করেন।

বিরোর ক্যাপ্টেন থমাস ভং বলেন, এভাবেই তাঁরা অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এএফপি অবলম্বনে