১০ ঘণ্টা পর আগুন নিভেছে

সাতজনের লাশ উদ্ধার, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা জ্বলেছে, পুড়ে গেছে সাতটি তাজা প্রাণ, আর ভস্মীভূত হয়েছে কয়েক শ কোটি টাকার সম্পদ। এর পরই গাজীপুরের আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস লিমিটেডের আগুন নিভেছে। এক দিন আগেও যেখানে ছিল কর্মচাঞ্চল্য, এখন সেখানে কেবলই ছাইভস্ম, স্বজনহারাদের আহাজারি এবং আড়াই হাজার কর্মীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বেরাইদেরচালা গ্রামে পলমল গ্রুপের ওই কারখানায় গত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ চেষ্টায় বুধবার ভোরে সেই আগুন নিভেছে। ইতিমধ্যে কারখানার ভেতর থেকে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বজনেরা চোখের পানিতে সেসব লাশ বুঝে নিয়েছেন। এর আগে নয়জনের কথা বলা হলেও লাশ পাওয়া গেছে সাতজনেরই।
অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন মামা-ভাগনে। তাঁরা হলেন কারখানার সহকারী ব্যবস্থাপক (এজিএম) রাশেদুজ্জামান (৩৩) ও তাঁর ভাগনে নাঈমুর রহমান (২৬)।
নাঈমুর কারখানার সহকারী ফিটারম্যান ছিলেন। তাঁদের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শঠিবাড়ি গ্রামে। নিহত অন্যরা হলেন রংপুরের পীরগঞ্জের বেলবাড়ি এলাকার নিটিং অপারেটর খলিলুর রহমান (২৬), মিঠাপুকুরের ধলারপাড়া এলাকার রুবেল মিয়া (২৩), দিনাজপুরের পার্বতীপুরের পাঁচনগরের বুলবুল ইসলাম (২৯), ফুলবাড়ী উপজেলার দরবিপুর এলাকার মিনহাজুল হক (২৩) ও কুড়িগ্রামের রাজীবপুরের ভোলামারী গ্রামের লাজু মিয়া ওরফে রাজু (২১)।

যেভাবে আগুনের সূত্রপাত: ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, কারখানার শ্রমিক ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবারও কারখানায় স্বাভাবিক কাজকর্ম চলছিল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নিটিং সেকশনের দ্বিতীয় তলার দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় থাকা স্ট্যান্ডার্ড মেশিনে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়। এরপর দোতলায় আগুন লেগে যায়। প্রায় সব শ্রমিকই এরপর বেরিয়ে আসেন। অল্প কয়েকজন কারখানার নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নিয়ে আগুন নেভাতে যান। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঘণ্টা খানেক পর গাজীপুর, কালিয়াকৈর, টঙ্গী, ভালুকা, সাভার ও ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে কারখানার এজিএম মো. রাশেদুজ্জামান ও তাঁর ভাগনে নাঈমুর রহমানের লাশ উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভবন ঘুরে এসে সাংবাদিকদের জানান, প্রাথমিকভাবে নয়জন মারা গেছেন বলে তাঁরা ধারণা করছেন। তবে ভোর সাড়ে চারটার দিকে আগুন নিভলে ভেতর থেকে আরও পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওই কারখানার অপারেটর শামীম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, দোতলায় কাজ করছিলেন তিনি। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে পরপর বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। এর পরই আগুন দেখেন। কারখানার তিনটি গেট দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় সবাই নিচে আসেন। এর মধ্যে রাশেদ স্যারও ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মোবাইলে ফোন আসে। তিনি জানান, নাঈম আটকা পড়ছে তিনতলায়। দ্রুত রাশেদ স্যার নাঈমকে উদ্ধার করতে চলে যান। এর মধ্যে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাঁরা কেউ আর বের হতে পারেননি। একইভাবে আরও কয়েকজন শ্রমিক আটকা পড়েন ভেতরে।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আক্তারুজ্জামান প্রথম আলোকে জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে সাতটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে আর কোনো লাশ থাকার সম্ভাবনা নেই। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানের জন্য ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) ফরিদ উদ্দিনকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে।

স্বজনদের আহাজারি: রাত দুইটার দিকে রাশেদ ও নাঈমের লাশ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয় শ্রীপুর উপজেলা প্রশাসন। রাশেদের স্ত্রীর বড় ভাই তোফায়েল আহমেদ ও চাচাতো ভাই মোহাম্মদ মাহফুজ লাশ নিয়ে যান। মাহফুজ প্রথম আলোকে জানান, আট বছর আগে রাশেদ বিয়ে করেছেন। তাঁর দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। বড়টির বয়স তিন, ছোটটির এক বছর। মাহফুজ জানান, চাচাতো বোনের ছেলে নাঈমকে রাশেদই এখানে চাকরি দিয়েছিলেন।

বুলবুল ইসলামের লাশ নিতে আসেন স্ত্রী সুমি আক্তার। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ছয়টায় তিনি কারখানার সামনে দেড় বছরের শিশুকন্যা মরিয়মকে নিয়ে আহাজারি করছিলেন। সুমি জানান, তাঁরা সপরিবারে বেরাইদেরচালা গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। রাতেই আগুন লাগার খবর পেয়েছেন। কিন্তু ভেবেছিলেন তাঁর স্বামী বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ভোর পর্যন্ত না ফেরায় সকালে কারখানায় এসে জানতে পারেন স্বামী আর নেই।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল ইসলাম জানান, স্বজনেরা শনাক্ত করার পরই লাশগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাশ দাফনের খরচের জন্য প্রতি পরিবারকে কারখানার পক্ষ থেকে ৫০ হাজার ও জেলা প্রশাসন থেকে আরও ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিহত ব্যক্তিদের প্রতি পরিবারকে পরে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

অনিশ্চয়তায় আড়াই হাজার শ্রমিক: আসওয়াদ টেক্সটাইল মিলসে প্রায় তিন শ এবং গার্মেন্টসে দুই হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, কারখানার কাজের পরিবেশ ভালো ছিল। নির্ধারিত সময়ে বেতন-বোনাস হতো। তাই এখানে কেউ চাকরি নিলে সহজে ছাড়তেন না। ৭ তারিখেই কারখানার সবার বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঈদের বোনাস দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন যে অবস্থা, তাতে বোনাস তো দূরের কথা, কবে কারখানা চালু হবে, আবার কাজ পাবেন কি না তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন।

দোতলা ওই কারখানাটি ঘুরে দেখা গেছে, ভেতরের সুতা, কাপড় থেকে আরম্ভ করে অনেক যন্ত্রপাতিও ভস্মীভূত হয়ে গেছে। ভবনের দেয়াল ও ছাদও প্রায় ধসে পড়েছে।

কারখানার ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগুনে ৯৮টি নিটিং মেশিন, যার প্রতিটির দাম ২৫ লাখ, একেকটি ৪০ কোটি টাকা করে চারটি স্ট্যান্ডার্ড মেশিন, একেকটি ৪২ কোটি টাকা করে দুটি প্রিন্টিং ওভারঅল মেশিন এবং বিপুল পরিমাণ মালামালসহ প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানার পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হলেই বলতে পারব আসল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।’

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহনওয়াজ দিলরুবা খান বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ, দায়ী কারা ও ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে প্রয়োজনীয় কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেসব বিষয়ে সুপারিশ করার জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মহসিনকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে।

গাজীপুর-৩ আসনের সাংসদ রহমত আলী, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক আলী আহম্মেদ খান, শিল্প পুলিশের প্রধান আবদুস সালাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ক্রেতাদের উদ্যোক্তা অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য অ্যান্ডি ইয়র্ক এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

বিজিএমইএর সংবাদ সম্মেলন: গতকাল রাতে মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ তাদের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, আসওয়াদ কম্পোজিটে উন্নত কর্মপরিবেশ ছিল। সর্বাধুনিক প্রযুক্তির অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি সেখানে ছিল। নিহত সাত শ্রমিকের সবাই ছিলেন অগ্নিনির্বাপক (ফায়ার ফাইটার)। আগুন নেভাতে গিয়েই আটকা পড়ে তাঁরা নিহত হয়েছেন।

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আসওয়াদ কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিস শিকদার, পলমল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ করিম, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বর্তমান সহসভাপতি এস এম মান্নান, শহিদুল্লাহ আজিম প্রমুখ।

নাফিস শিকদার বলেন, ‘লাশ দাফনের জন্য নিহত প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে আমরা ৫০ হাজার করে টাকা দিয়েছি। পরে সাড়ে চার লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিমা বাবদ প্রত্যেকে দুই লাখ করে টাকা পাবেন।’

নাফিস শিকদার আরও বলেন, ‘আসওয়াদ কম্পোজিট দেশের সবচেয়ে বড় কম্পোজিট কারখানা। এখানে অগ্নিনির্বাপণের সব ধরনের সরঞ্জাম থাকার পরও এক লাখ ১৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের তিনটি ইউনিটে আগুন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এটা আমাদের জন্য একটি নতুন বার্তা।’

এর আগে নাফিস শিকদার গতকাল বিকেলে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিহত শ্রমিকদের লাশ দেখতে যান। এ সময় তিনি স্বজনদের উদ্দেশে বলেন, নিহতদের পরিবারের কেউ চাকরি করতে চাইলে এই কারখানায় আজীবন চাকরি করতে পারবেন।