ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি

সারা দেশে এগিয়ে আ. লীগ বিএনপির টার্গেট ৪০ হাজার

বিএনপির নির্বাচন প্রতিরোধে সংগ্রাম কমিটি গঠনের ঘোষণার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনী কমিটি। এর আগে নির্বাচনের সময় এসব কমিটি করা হলেও এবার এসব কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগে ভিন্ন চিন্তা কাজ করছে। তবে এ কমিটি গঠনের জন্য সারা দেশে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা গেলেও তা করতে গিয়ে স্থানীয় নানা কোন্দলের মুখে পড়ছেন জেলা নেতারা। ফলে কমিটি করতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানা গেছে। আবার অনেক জেলায় কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। দেশের সাত বিভাগের বিভিন্ন জেলার আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
অন্যদিকে সংসদে বিরোধী দলের নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নির্দেশ পেয়ে সারা দেশের জেলা নেতারা বুথকেন্দ্রিক নির্বাচন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটি গঠনের কার্যক্রম শুরু করেছেন। সারা দেশে প্রায় ৪০ হাজারের মতো কমিটি গঠন করা হবে। দেশের ৭৫ সাংগঠনিক জেলায় সিনিয়র নেতারা সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন বলে বিএনপির বিভিন্ন সূত্র জানায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডে কেন্দ্রভিত্তিক এক হজার ৬০০ কমিটি গঠনের কাজ শেষ করেছে। তবে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকরা বলেন, সারা দেশেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করার জন্য। জেলা নেতারা বলছেন, কেন্দ্রভিত্তিক এসব কমিটি শুধু ভোটের দিনই কাজ করবে এমন নয়। বিএনপির নির্বাচন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির বিপরীতে দাঁড়াবে আমাদের এসব কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি। যাতে সারা দেশে নির্বিঘ্নে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে।
স্থানীয় কোন্দলের ইঙ্গিত দিয়ে চট্টগ্রাম উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সালাম বলেন, ‘কেন্দ্রভিত্তিক এসব নির্বাচনী কমিটি সবার মতামতের ভিত্তিতে করতে হবে। আমরা করলাম, অন্যরা সেটা মানলেন না- এ ধরনের জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আলোচনার ভিত্তিতে কমিটি করার কারণে কিছুটা সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। শিগগিরই এ কাজ শুরু করব।’
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান মজনু বলেন, ‘কেন্দ্রের নির্দেশনা পেয়েছি। ঈদের পর কাজ শুরু করব।’ তিনি বলেন, ‘কমিটি গঠন করতে গেলে স্থানীয়ভাবে কিছু জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এসব নিরসন করেই কাজ শুরু করব।’
জামালপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট বাকী বিল্লাহ বলেন, ‘কেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচনী কমিটির কাজ প্রায় শেষ। কেন্দ্রের নির্দেশ পাওয়ার পরপরই আমরা কাজ করেছি। এক তৃতীয়াংশ এলাকায় এ কমিটি গঠনের কাজ প্রায় শেষ। কমিটি হয়েছে সর্বনিম্ন ৭১ থেকে ১০১ সদস্যের।’ এদের কাজ কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এলাকায় জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা, ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাসহ বিভিন্ন নির্বাচনী কার্যক্রম সূচারু রূপে পালন করা। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গেই জনগণ আছে। বিএনপির নির্বাচন প্রতিরোধ কমিটির ঘোষণাকে আমরা ভয় পাই না।’
গাইবান্ধা জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠনের কাজ আমরা ঈদের পরপরই শুরু করব।’ এ বিষয়ে কেন্দ্রের নির্দেশনা পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
যশোর জেলার সভাপতি আলী রেজা রাজু বলেন, ‘আমরা এখনো কাজ শুরু করিনি। ঈদের পর শুরু করব।’ পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক খান মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেয়েছি। এখনো কাজ শুরু করতে পারিনি।’
সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘কমিটি গঠনের জন্য থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। শিগগিরই কাজ শুরু হবে।’
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন, কেন্দ্রভিত্তিক এসব কমিটি শুধুই নির্বাচনে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে দল মনোনীত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য গঠন করা হচ্ছে। তাই এ কমিটি দলের জন্য জরুরি। তিনি বলেন, ‘সব জেলায় কমিটি গঠনের জন্য মোবাইলে ও যেসব জেলা সফর শেষ করেছি তাদের সরাসরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
রাজশাহী বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অপর সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, কমিটি গঠনের জন্য অলরেডি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও কাজ শুরু হয়েছে। ঈদের পর পুরোদমে কমিটি গঠনের কাজ শুরু হবে।
এদিকে ২৪ অক্টোবরের মধ্যে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মেনে না নিয়ে সরকার যদি একতরফা নির্বাচন করার চেষ্টা করে বিএনপি তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছে। নির্বাচন প্রতিহত করার জন্যই ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এই নির্দেশ পেয়ে কাজ শুরু করেছেন দলটির নেতারা। সারা দেশে প্রায় ৪০ হাজার সংগ্রাম কমিটি গঠনের জন্য গত মঙ্গলবার জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এই তথ্য স্বীকার করে দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেন, সংগ্রাম কমিটি গঠনের জন্য এরই মধ্যে বেশির ভাগ জেলায় চিঠি পাঠানো হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে অন্তত জেলা কমিটি গঠনের অগ্রগতি কেন্দ্রকে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটি গঠনের জন্য বলা হয়েছে। সারা দেশে যতগুলো ভোটকেন্দ্র ততগুলোই কমিটি হবে। তিনি জানান এই কমিটির সমন্বয় করবেন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। বিএনপির নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন এমন এক নেতার মতে, নির্বাচনের সময় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার ভোট কেন্দ্র থাকে। সব জায়গাতেই সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হবে।
গত ৫ অক্টোবর সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে ১৮ দলীয় জোটের জনসভায় খালেদা জিয়া সরকারের একক নির্বাচন প্রতিরোধে কেন্দ্রভিত্তিক ‘সর্বদলীয়’ সংগ্রাম কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। নেত্রীর নির্দেশ পেয়েই দলের নেতারা কমিটি গঠনের কাজ শুরু করেছেন। এ ছাড়া গত সোমবার রাতে গুলশানের কার্যালয়ে খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সংগ্রাম কমিটি গঠন প্রক্রিয়া শুরুর নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের পর দলের সাংগঠনিক জেলাগুলোকে চিঠি দিয়ে কমিটি গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়। মঙ্গলবার সেই চিঠি বিএনপির সাংগঠনিক ৭৫ জেলার বেশির ভাগ জায়গায় পাঠানো হয়। বাকিগুলো গতকাল বুধবার ও আজ বৃহস্পতিবার পাঠানো হবে। তবে ঈদের পর কমিটি গঠনের কাজ শেষ হবে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জেলা থেকে থানা-ইউনিয়ন, প্রয়োজনে গ্রাম পর্যায়েও কমিটি হবে। এই কাজ সমন্বয় করবেন সংশ্লিষ্ট জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সংগ্রাম কমিটিতে রাখা হবে। প্রতি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপিসহ ১৮ দলের নেতা-কর্মী ছাড়াও সব শ্রেণীর মানুষের প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত রবিবার দলের সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দাসের বাজার হাইস্কুল কেন্দ্রে প্রথম সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী মনিরুজ্জামান ও ফেনী জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই কাজ করছি। এখন ঘোষণা আসায় এক সপ্তাহের মধ্যে ফেনীর সব ভোটকেন্দ্রে সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হবে।’ কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, ‘চেয়ারপারসন নির্দেশ দেওয়ার আগে থেকেই আমরা নির্বাচন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। ম্যাডামের নির্দেশের পর তা সাংগঠনিক কাঠামো পেল।’