সেলিম লাঞ্ছিত, আজ সিলেটে নগরে হরতাল, ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল

সিপিবি-বাসদের সমাবেশে হামলা

সিলেটে গতকাল রোববার বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বিভাগীয় সমাবেশে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমসহ অন্তত ১৫ জন আহত হন। হামলাকারীরা তাঁকে টেনেহিঁচড়ে মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনেন। সমাবেশে বক্তারা সরকারবিরোধী বক্তৃতা দেওয়ায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এই হামলা চালান বলে জানা গেছে।ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সিলেট নগরে আজ সোমবার আধা বেলা হরতাল ডাকা হয়েছে। গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে নগরের সুরমা মার্কেট এলাকার একটি রেস্তোরাঁর মিলনায়তনে বাসদ ও সিপিবি সংবাদ সম্মেলন করে হরতালের পাশাপাশি আজ সকালে সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়।এদিকে এ ঘটনার পর গত রাতে কেন্দ্র থেকে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বিএনপি সিপিবি-বাসদের এই হরতালে সমর্থন দিয়েছে। দলটির দপ্তর সম্পাদক রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সমর্থন জানানো হয়। তবে সিপিবি-বাসদ বিরোধী দলের সমর্থনকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দল দুটি গত রাতে জানায়, বিএনপির নেতারা তাঁদের আহত নেতা-কর্মীদের কোনো খোঁজখবর নেননি। সুতরাং তাঁদের সমর্থন গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কোর্ট পয়েন্টে সিপিবি-বাসদের জনসভা শুরু হয়। পৌনে পাঁচটার দিকে ছাত্রলীগের কর্মীরা ককটেল ফাটিয়ে সমাবেশে হামলা চালালে ছাত্র ইউনিয়ন, সিপিবি ও বাসদের কর্মীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এতে ছাত্রলীগের কর্মীরা পিছু হটেন। কিছুক্ষণ পর সংঘবদ্ধ হয়ে আবার তাঁরা সমাবেশে হামলা ও ভাঙচুর করেন। এতে জেলা সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সহিদুজ্জামানসহ ১৭ জন আহত হন।

সূত্র জানায়, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি হিরণ মাহমুদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা মঞ্চে উঠে সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলামের ওপর চড়াও হন। ‘সরকারের বিরুদ্ধে বলছিস কেন, জামায়াতের চর…!’ প্রভৃতি কথা বলে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনেন। এ সময় তিনি বাঁ হাতে আঘাত পান। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা সংঘবদ্ধ হয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের প্রতিরোধ করেন। এতে তাঁরা পিছু হটেন। পরে সাড়ে পাঁচটার দিকে আবার তাঁরা সমাবেশে হামলা চালানোর চেষ্টা করলে র‌্যাব-পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিতে ফাঁকা গুলি করে। এ সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নগর ভবনে অবস্থান নেন।

হামলার কারণ সম্পর্কে জানতে হিরণ মাহমুদের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। তবে সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন প্রথমআলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সিলেট আগমন উপলক্ষে তাঁরা তালতলা এলাকা থেকে আনন্দ মিছিল বের করেন। মিছিলটি সমাবেশের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ‘ধর ধর’ আওয়াজ আসায় ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে হামলা চালান। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতির নেতৃত্বে সিপিবির কেন্দ্রীয় সভাপতিকে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

সিপিবির সিলেট জেলা সভাপতি বেদানন্দ ভট্টাচার্য অভিযোগ করেন, ‘পরিকল্পিতভাবে সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে হামলা চালিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাসহ স্থানীয় কর্মীদের রক্তাক্ত করেছে। অথচ পুলিশের ভূমিকা ছিল নীরব।’

তবে মহানগর পুুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মোহাম্মদ আয়ূব বলেন, ‘হামলা ঠেকাতে গিয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি আখতার হোসেনসহ পুলিশের তিন সদস্য আহত হন। এর পরও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সমীচীন নয়।’

ছাত্রলীগের হামলার পর আবার সমাবেশ শুরু হয়। এ সময় মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা আমাদের সমাবেশে হামলা চালিয়ে কর্মী-সমর্থকদের নির্মমভাবে পিটিয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, এদের হাতে দেশ নিরাপদ নয়।’ তিনি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে বিকল্প তৃতীয় শক্তির অবস্থান জোরদার করার আহ্বান জানান।

বাসদের খালেকুজ্জামান বলেন, ‘ছাত্রলীগের কর্মীরা হামলা চালিয়েছে, অথচ পুলিশ নির্বিকার। তারা যদি আমাদের কথা পছন্দ না করে, তাহলে কাল-পরশু একই স্থানে সমাবেশ করে তারা নিজেদের কথা বলতে পারত। তাই বলে এভাবে হামলা চালিয়ে কণ্ঠ স্তব্ধ করার ন্যক্কারজনক মনোভাব মেনে নেওয়া যায় না।’

সমাবেশের শুরুতেই গণসংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু।

বিভিন্ন সংগঠনের নিন্দা: সিপিবি-বাসদের সমাবেশে হামলার ঘটনায় গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিশিষ্ট সাংবাদিক কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদসহ বিভিন্ন সংগঠন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিন্দা জানিয়েছেন।