ক্যান্সার হাসপাতালে ভয়ঙ্কর চক্র

সিরিয়াল পেতেই তিন হাজার টাকা ঘুষ!

সাহাদাত হোসেন পরশ অবশেষে তিনি ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সিরিয়াল পেয়েছেন। এর আগেই ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে করতে হয়ে পড়েছেন নিঃস্ব। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চা বিক্রেতা নজরুল ইসলামের কণ্ঠেই শোনা যাক সে কাহিনী_ ‘টানাপড়েনের সংসারে আসা-যাওয়া করতে অনেক সমস্যা। গাড়িতে আসার সময় বসে থাকতে থাকতে রোগীর পা ফুলে যেত। তারপরও হাসপাতালে সিরিয়াল পাওয়ার জন্য প্রতি সপ্তাহে দু-তিনবার করে ঢাকায় আসতাম। আজ-কাল করে করে সাত সপ্তাহ ঘুরেছি। একদিন মহাখালী রজনীগন্ধা হোটেলে ছিলাম। রাতে টাকার অভাবে চিড়া খাই। পরে মিরপুরের এক আত্মীয়কে খবর দিয়ে কিছু টাকা জোগাড় করি। পরদিন আবার সিরিয়াল নেওয়ার জন্য হাসপাতালে যাই। এরপরও সিরিয়াল পাইনি। শেষ পর্যন্ত আরও চারদিন অপেক্ষার পর সিরিয়াল পেয়েছি।’ ক্যান্সার চিকিৎসায় দেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চিত্র এটি। স্ত্রীর চিকিৎসার সুযোগ পেতে সেখানে টানা সাত সপ্তাহ ঘুরে অবশেষে টাকার বিনিময়ে সেই সুযোগ পেয়েছেন নজরুল। গায়ে তার ময়লা আর জীর্ণ পোশাক। চোখমুখে ভীষণ অসহায়ত্বের ছাপ। কথায় বিনয় আর মৃদু ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। অনেক ঘোরাঘুরির পর তিন হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে সিরিয়াল পেলেও অজানা আতঙ্কে অসাধু কর্মচারীকে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করতেও তার ভয়। চিকিৎসা শুরুর আগেই চিকিৎসাসেবার দুয়ারে পেঁৗছতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের একেকটি পরিবারের সদস্যের কষ্টের যেন শেষ নেই। প্রায় প্রতিটি রোগীকেই চিকিৎসার সিরিয়াল পেতে সেখানে ঘুষ দিতে হয় কমপক্ষে তিন হাজার টাকা। পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে সিরিয়াল পেয়েছেন এমন রোগীর খবরও সমকালের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে। অনেককে ঘোরানো হয় শুধু টাকার জন্যই। এমনই একজনের দেখা পাওয়া গেল, কিছুতেই নাম প্রকাশে রাজি নন তিনি। টাকা দিয়ে সুবিধাজনক সিরিয়াল নেওয়ার সামর্থ্য নেই তার। তাই ঘুরছেন তিন সপ্তাহ থেকে। টাকা আছে তো ক্যান্সার হাসপাতালে সিরিয়াল আছে। হাসপাতালটির নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকও স্বীকার করলেন, একটি অসাধু চক্র এমন নির্মম বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। জানা গেল মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের খুরমা এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলামের স্ত্রী জয়গুন্নেসা বেগমের দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সার। সামান্য জমি-জমা, গরু বিক্রি ও জমানো সব টাকা খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে প্রথমে কিছু দিন স্ত্রীর ক্যান্সার চিকিৎসা করিয়ে এখন নিঃস্ব নজরুল। একখানি ছোট্ট চায়ের দোকান তার সম্বল। উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত হাজির হন সরকারি চিকিৎসালয়ে। সেখানে গিয়ে পড়েন আরেক চক্রে। রেডিওথেরাপি করানোর সিরিয়াল পেতে দিনের পর দিন ঘুরতে থাকেন। কষ্ট, বেদনা আর অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতার পথ পাড়ি দিয়ে রেডিওথেরাপি করানোর সিরিয়াল পান তিনি। আপাতত হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেও তার স্ত্রী পৃথিবীর আলো কত দিন দেখবেন এটা নিয়ে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। দু’দিন জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল ঘুরে ক্যান্সার চিকিৎসা পাওয়ার আগেই গরিব একেকজন রোগীর স্বজনকে নিয়ে যে বাণিজ্যের দৃশ্য চোখে পড়েছে তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। যারা সেখানে চিকিৎসা প্রত্যাশী তাদের অধিকাংশের শরীরেই ময়লা-জীর্ণ পোশাক। কারও কারও হাতে ছোট ছোট বাক্স আর পুঁটলি। দেখেই মনে হয় গ্রাম থেকে এসেছেন। এসব বাক্স-পুঁটলির ভেতরই হয়তো সহায়-সম্পত্তি বিক্রির শেষ অর্থটুকু। অত্যন্ত দরিদ্র মানুষের এসব অর্থের ভাগ যে চিকিৎসার নামে শহরের ‘চোর-বাটপার’ হাতিয়ে নেবে, তা অনেকের চিন্তায়ও ছিল না। ক্যান্সার হাসপাতালে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ও আগে ভর্তির সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে একটি চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার হাজার টাকা। ক্যান্সার আক্রান্ত অনেক রোগীর স্বজনই নিজেদের সহায়-সম্বল বিক্রি করে এসব টাকা জোগাড় করে রাজধানীতে আসেন। শুধু বাইরের দালাল চক্র নয়, জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে সরাসরি এ ভয়ঙ্কর বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। সমকালের অনুসন্ধানে এদের অনেকের নাম উঠে এসেছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে নেওয়ার চক্রও চোখে পড়েছে। ‘ক্যান্সার হোম’ নামে একটি হাসপাতালের বেশ কয়েকজন দালালকেও বিভিন্ন রোগীর স্বজনকে প্রলুব্ধ করতে দেখা যায়। এ ব্যাপারে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস কে গোলাম মোস্তফা সমকালকে বলেন, প্রতিদিন যে সংখ্যক রোগী রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির জন্য আসেন, সে তুলনায় আমাদের মেশিনের সংখ্যা অনেক অপ্রতুল। একটি মেশিন অনেক সময় নষ্টও থাকে। এ কারণে অনেক রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকেন। চিকিৎসার দীর্ঘসূত্রতার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ সিরিয়াল আগে-পেছনে করানোর কথা বলে রোগীর কাছে টাকা দাবি করে_ এটা আমাদেরও কানে এসেছে। হাসপাতালের পরিচালক আরও বলেন, আমি এখানে অল্প কিছুদিন হয়েছে যোগদান করেছি। কিছু অনিয়মের কথা জানার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেছি। হাসপাতালের সামনে অভিযোগ বাক্স বসানো হয়েছে। ক্যান্সার আক্রান্ত হলে শুধু রোগী নন, তাদের স্বজনরাও ভেঙে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে তাদের নিয়ে কোনো বাণিজ্য গর্হিত অপরাধ। দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে কি-না_ এমন প্রশ্নে হাসপাতালের পরিচালক বলেন, দুর্নীতি ও টাকা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকায় লুৎফুর রহমান নামে এক কর্মচারীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। দু’জনকে খুলনা ও সাতক্ষীরায় বদলিও করা হয়েছে। জানা গেছে, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালটি দেড়শ’ শয্যার। এরমধ্যে ৬০ শতাংশ পেয়িং বেড (ভাড়া পরিশোধ করে রোগীর বিছানা বন্দোবস্ত) আর ৪০ শতাংশ ননপেয়িং। গত রোববার ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ১২৭ জন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী। তবে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যে সংখ্যক ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী চিকিৎসা নেন, তার চেয়ে বেশি নেন আউটডোরে। তারা কেউ কেউ বাসা-হোটেলে ভাড়া, আত্মীয়র বাসায় অবস্থান করে বা গ্রাম থেকে আসা-যাওয়া করে চিকিৎসা নেন। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর প্রতি রেডিওথেরাপিতে সরকারি খরচ ২শ’ টাকা আর কেমোথেরাপি বিনা মূল্যে হয়ে থাকে। তবে কেমোথেরাপির জন্য কিছু ওষুধ নিজের টাকা খরচ করে কিনতে হয়। কিছু ওষুধ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করে। অত্যন্ত গরিব-নিঃস্ব বলে এলাকার জনপ্রতিনিধি কোনো রোগীকে সুপারিশ করলে তাকে পুরোপুরি বিনা খরচে রেডিওথেরাপি দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, দেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রতি বছর ১৩ শতাংশ রোগী মারা যান। দিনে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা হাসপাতালেই আড়াই শতাধিক রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। ৩টি লেনিয়ার এক্সেলেটর যন্ত্রের মাধ্যমে রেডিওথেরাপি করানো হয়। দিনে একেকটি যন্ত্রে অন্তত ৭০ জনকে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়। একেকজন রোগীর রেডিওথেরাপি শেষ হতে দেড় মাসের মতো প্রয়োজন। তাই নতুন রোগী ছাড়া এ চিকিৎসায় পুরনো রোগী অসংখ্য। প্রতি বছরই ৫-৬ হাজার রেডিওথেরাপির জন্য আসা রোগী অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকেন। অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকেন কেমোথেরাপির জন্য আসা রোগীরাও। সরেজমিন হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, রেডিওথেরাপি আর কেমোথেরাপি করানোর জন্য অপেক্ষা করছেন একেকজন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও তাদের স্বজনরা। মেশিন নষ্টের কথা বলে তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। এরপর আবার নতুন তারিখ দেওয়া হয়। কেউ আবার সিরিয়াল পাওয়ার আশায় রাত-দিন বসে থাকেন। কেউ আবার ঢাকায় বাসা ভাড়াও নিয়েছেন। রোববার দুপুরে রেডিওথেরাপি করানোর কক্ষের সামনে বসে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব সুফিয়া বেগম। ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত সুফিয়ার বাড়ি ভোলা সদরে। বোনের ছেলে মো. মিঠুকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন। তার স্বামী অনেক আগেই মারা যান। একমাত্র মেয়ে নূরজাহানও শারীরিক প্রতিবন্ধী। ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য সুফিয়া ইতিমধ্যে জমি-জমা বিক্রি করেছেন। এখন তার সম্বল কেবল নিজের বসতভিটা। কতদিন সেই ভিটা রাখতে পারবেন সেটা নিয়ে তার আশঙ্কার শেষ নেই। সুফিয়া জানান, একটি প্রাইভেট হাসপাতালে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর রেডিওথেরাপি নেওয়ার জন্য জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতালে আসেন। তবে এখানে এসেই নানা ভোগান্তির শিকার হন। ভৈরবের বাসিন্দা ক্যান্সার আক্রান্ত সেলিনা বেগমকে নিয়ে আসেন তার ছেলে বউ আয়েশা বেগম। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর আয়েশা জানান, আমরা যে হয়রানির শিকার হয়েছি, আর যেন কোনো রোগীর কপালে তা না জোটে। অনুসন্ধানে জানা যায়, হাসপাতালের প্ল্যানিং রুমের এমএলএসএস মো. ফারুক ও বজলুর রহমানকে নগদ টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেই অনেকে সিরিয়াল এদিক-ওদিক করেন। ২শ’ টাকায় রেডিওথেরাপি করাতে অনেকে চার-পাঁচগুণ বেশি টাকা দাবি করে। ফারুক নিজেকে পরিচয় দেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট হিসেবে। নাম প্রকাশে ভীত একাধিক রোগীর স্বজন জানান, ডেসপাস শাখার রনিও রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য। রোগীর স্বজন সেজে দোতলায় রনির সঙ্গে দেখা করলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনার রোগী নিয়ে আসেন। কিছু টাকা খরচ করবেন। এরপর চিকিৎসা করিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।’ রোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে নেওয়া অর্থের ভাগ এক সময় হাসপাতালটির পরিচালক এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কোনো কোনো চিকিৎসকও পেতেন। নতুন পরিচালক এসেছেন, কিছু কাজও শুরু করেছেন। কিন্তু সেই চক্র পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।