সিরিয়া সংকটের সমাধান কোন পথে…আলী রীয়াজ

সিরিয়া সংকট সমাধানের পথ কি খুলতে শুরু করেছে? নাকি সিরিয়া সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার সত্ত্বেও পার পেতে চলেছে? নাকি জনসমর্থনের অভাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকার যুদ্ধের পথ থেকে সরে আসছে? সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রবিষয়ক নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে এসব প্রশ্নই এখন সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সময় সোমবার সকালে যে যুদ্ধ আসন্ন বলে মনে হচ্ছিল, দিনের শেষে তা এড়ানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। সিরিয়ায় নাগরিকদের ওপর ২১ আগস্টের রাসায়নিক অস্ত্র আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সিরিয়ায় বিমান হামলার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তা থেকে আপাতত সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলকে সোমবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিরিয়া সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন এবং গত কয়েক সপ্তাহে যেভাবে সামরিক অভিযানকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন, তা থেকে বিরত থেকেছেন। প্রেসিডেন্ট ওবামার যুক্তরাষ্ট্র সময় মঙ্গলবার রাতে (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে) এক টেলিভিশন ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এ নাটকীয় অগ্রগতির সূচনা হয় যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ মার্কিন সামরিক অভিযান এড়াতে পারেন, যদি তাঁর সরকার সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রভান্ডার এ সপ্তাহের মধ্যে হস্তান্তর করে। যদিও জন কেরি বলেন যে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত সিরিয়ায় এটা করা অসম্ভব এবং আসাদ তা করবেন না। কেরি এ প্রস্তাবের বিষয়টি বলেন এক প্রশ্নের উত্তরে। কিন্তু কেরির এ প্রস্তাবে রাশিয়ার পক্ষে থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলেন যে রাশিয়া আসাদকে চাপ দেবে যেন সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে হস্তান্তর করে এবং এর পরে সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা হবে। এসব আলোচনায় স্পষ্ট হয় যে, এ প্রস্তাব জন কেরি প্রথম সংবাদমাধ্যমে উপস্থাপন করলেও প্রস্তাবটি এসেছে রাশিয়ার কাছ থেকে। রাশিয়া সংকট সমাধানে প্রস্তাবটি কূটনৈতিক মহলে উপস্থাপন করে সে বিষয়ে অনুকূল মতামত তৈরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল এবং কেরিকে সে বিষয়ে অবহিত করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরি যখন লন্ডনের পথে প্লেনে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কোনো কোনো সূত্র কেরির প্রস্তাবকে ‘কথার কথা’ বলে খানিকটা লঘু করার চেষ্টা করলেও দেখা যায় যে প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন, একে তিনি ‘ব্রেক থ্রু’ বা বড় ধরনের অগ্রগতি বলে চিহ্নিত করেন। সিরিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাবের ব্যাপারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। মার্কিন টেলিভিশন সাংবাদিক চার্লি রোজের সঙ্গে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাসার আল-আসাদ সিরিয়ার কাছে কোনো ধরনের রাসায়নিক অস্ত্র আছে, তা অস্বীকার করলেও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ প্রস্তাবের প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান এবং বলেন যে সিরিয়া এ পদক্ষেপে রাজি রয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির পক্ষ থেকেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, ‘রুশদের কাছ থেকে আমরা যেসব বিবৃতি শুনেছি, সিরিয়ানদের কাছ থেকে যেসব বিবৃতি শুনেছি, সেগুলো সম্ভাব্য ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়।’ এনবিসি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওবামা বলেন, ‘এ বিষয়ে জন কেরি তাঁর রুশ প্রতিপক্ষের সঙ্গে, আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে কথা বলবেন। আমরা দেখব যে এসব প্রস্তাব কতটা সিরিয়াস।’ লক্ষণীয় বিষয় হলো যে সিএনএনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন যে জি-২০ শীর্ষ বৈঠকের সময় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এ ধরনের একটি সমাধান নিয়ে তাঁর আলোচনা হয়েছে। তাঁর এই মন্তব্যে বোঝা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিলেও কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল। ওবামা এ-ও বলেন যে সামরিক অভিযানের চাপ তৈরি না হলে সিরিয়া কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি হতো না। সে জন্য তিনি সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখবেন। এ নতুন কূটনৈতিক সমাধানের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তিনি বলেন যে এ প্রস্তাবের কারণে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ‘বিব্রতকর অসাড়তা’ থেকে মুক্তি পেতে পারে। এ সুযোগে পরিষদ সিরিয়াকে রাসায়নিক অস্ত্রবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করতে পারবে। এ প্রস্তাবকে বিভিন্ন মহল ইতিবাচক বলে বর্ণনা করলেও অনেক রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক সংশয় ও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য হলো, রাসায়নিক অস্ত্র হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং সিরিয়া তাতে করে সময় পাবে, যা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানকে জোরদার করার কাজে ব্যবহূত হবে। এ পদক্ষেপে যাঁরা অসন্তুষ্ট, তাঁরা মনে করেন যে কোনো দেশে রাসায়নিক অস্ত্র খুঁজে বের করে তা ধ্বংস করা একটি অসম্ভব ব্যাপার। তাঁদের ধারণা, রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করার কাজে রাশিয়ার সহযোগিতার প্রস্তাব আন্তরিক নয়। ওবামার সমালোচক ও তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করেন যে এ মুহূর্তে এ ধরনের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সমর্থন তাঁর নেতৃত্বের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে। তাঁরা এ-ও মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র কেন এই অভিযান চালাবে, সে বিষয়ে যুক্তি দেখাতে পারেননি বলেই এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হয়েছেন। এঁদের মধ্যে রিপাবলিকান পার্টির সেই সব নেতাও আছেন, যাঁরা এত দিন প্রেসিডেন্ট ওবামার যুদ্ধ প্রস্তুতির পক্ষে ছিলেন। সিরিয়ার বিদ্রোহী সেনাবাহিনী ফ্রি সিরিয়ান আর্মির প্রধান জেনারেল সালিম ইদ্রিস রাশিয়ার দেওয়া প্রস্তাবকে ‘নতুন মিথ্যা’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং এসব সামরিক অভিযান এড়ানোর চেষ্টা বলেই মনে করেন। সোমবার রাতে সিএনএনের প্রকাশিত জনমত জরিপে দেখা যায় যে ৫৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক যেকোনো ধরনের সামরিক অভিযানের বিরোধী। যদিও ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করে যে আসাদ সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে। জরিপের উত্তরদাতাদের ৫৯ শতাংশ মনে করে, সামরিক অভিযানের অনুমোদনসংক্রান্ত প্রস্তাব কংগ্রেসের পাস করা উচিত নয়। প্রেসিডেন্টকে সিরিয়া আক্রমণের অনুমোদনের ব্যাপারে যে প্রস্তাব বিবেচনার জন্য কংগ্রেসে পাঠানো হয়েছে, তার প্রতি প্রয়োজনীয় সমর্থন নেই বলেই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সিনেটে বুধবার এ বিষয়ে যে পদ্ধতিগত ভোট হওয়ার কথা ছিল, তা এখন স্থগিত করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা ইতিমধ্যে প্রতিনিধি সভার সব সদস্যের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন এবং সব সিনেটরের সঙ্গেও বৈঠক করবেন। কিন্তু এতে করে তাঁর প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন বাড়বে বলে মনে হয় না। ডেমোক্র্যাটদের অনেকেই আশা করছেন যে শেষ পর্যন্ত যেন এ ভোট না হয়। কেননা, তাঁরা একদিকে প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করতে চান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক, তা চান না। সিরিয়া সংকট সমাধানে সাম্প্রতিক এ কূটনৈতিক উদ্যোগ সাফল্য লাভ করবে কি না, তা বোঝা যাবে আগামী কয়েক দিনে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না, তার ওপর। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানালেও, বিমান অভিযান চালানোর যে সামরিক প্রস্তুতি, তা ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তাই এ বিষয়ে অগ্রগতি না হলে সিরিয়ায় মার্কিন হামলার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। ওয়াশিংটন থেকে আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।