সুন্দরবন সুরক্ষার সংগ্রাম…পাভেল পার্থ

১৯৯৫ সালের ১নং আইন অনুসারে গৃহীত হয় দেশের প্রথম পরিবেশ আইন ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’। প্রথম কোনো জাতীয় আইনে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার’ কথা উল্লেখ করে উলি্লখিত আইনের ৫নং ধারায় বলা হয়, সরকার যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, পরিবেশের অবক্ষয়ের কারণে কোনো এলাকার প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংকটাপন্ন অবস্থায় উপনীত হয়েছে বা হওয়ার আশঙ্কা আছে তাহলে সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করতে পারবে। পরে তৈরি হয় ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭’। ওই বিধিমালার ৩নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার সময় মানববসতি, প্রাচীন স্মৃতিসৌধ, প্রত্নতাত্তি্বক স্থান, অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান, গেম রিজার্ভ, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ, বনাঞ্চল, এলাকাভিত্তিক প্রাণবৈচিত্র্য এবং সংশ্লিষ্ট আরও বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। পরে ২০১০ সালের ৫০নং আইন হিসেবে গৃহীত হয় ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন ২০১০’। ওই আইনের ২নং ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা মানে এ আইনের দ্বারা ঘোষিত এমন এলাকা যা অন্যান্য জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বা পরিবেশগত বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হতে রক্ষা করা বা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি, সেন্টমার্টিন দ্বীপ, টেকনাফ সমুদ্র উপকূল, বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা-তুরাগ ও বালু নদী, গুলশান-বারিধারা লেকের পাশাপাশি সুন্দরবনকেও দেশের ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ১৯৯৯ সালে সুন্দরবনের আশপাশের ১০ কিলোমিটার এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। নিদারুণভাবে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরত্বে সব আইন লঙ্ঘন করে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের এক যৌথ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উন্নয়ন প্রকল্প। ফলে সুন্দরবনের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাসহ পুরো ম্যানগ্রোভ বাস্তুসংস্থানই ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যেতে বাধ্য হবে। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার বিরুদ্ধে আর্থিক দণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও রাষ্ট্র সুন্দরবনকে খুন করে ১৩২০ মেগাওয়াটের এ রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের উন্নয়ন-বাহাদুরি শুরু করেছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি) যৌথভাবে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের নলিয়ান থেকে ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। গত ২০ এপ্রিল বাংলাদেশ-ভারত ‘খুলনা বিদ্যুৎ প্রকল্পের’ চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্পটি ইতিমধ্যে বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার সাপমারী-কাটাখালী মৌজার ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে, যার ভেতর কৃষিজমির পরিমাণ ১ হাজার ৭৪৫ একর। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের আগে ‘প্রাথমিক পরিবেশগত সমীক্ষা (আইইই)’ ও ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ)’ করতে হয়। এসব সমীক্ষা প্রতিবেদনের মাধ্যমে যদি পরিবেশ অধিদফতর ছাড় দেয়, তবেই কোনো প্রস্তাবিত প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। কিন্তু দেশীয় পরিবেশসংক্রান্ত আইন ও বিধি অমান্য করে কোনো ধরনের পরিবেশগত সমীক্ষা কি মূল্যায়নের আগেই এ প্রকল্পের কাজ ও জমি অধিগ্রহণ শুরু হয়েছিল। পরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড’ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রস্তাবিত রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন’ প্রকাশ করে। ৬৭৬ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদন সুন্দরবনকে ম্যানগ্রোভ বাস্তুসংস্থান হিসেবে দেখেনি। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অঞ্চলটির উপযোগিতাকেই জোরজবরদস্তি করে ‘প্রমাণ’ করার চেষ্টা করেছে ইআইএ প্রতিবেদন। ওই প্রতিবেদনে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কতগুলো আইন-নীতি-ঘোষণা ও সনদের একটা একেবারেই গাফিলতি করে সংক্ষিপ্তসার হাজির করা হয়েছে। এসব আইন ও নীতি কেন এ ইআইএ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলো, এসব আইন ও নীতির বিভিন্ন ধারা এবং বিধির সঙ্গে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ প্রকল্প কি সাংঘর্ষিক না সমান্তরাল তা কিন্তু কোনোভাবেই এখানে উলি্লখিত হয়নি। বরং ভুলভাবে কোনো আইনকে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২’কে একবার ‘আইন (পৃষ্ঠা-২৮)’ এবং আরেকবার ‘বিল (পৃষ্ঠা-২৯)’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে বন সংরক্ষণের ওপর সরকার একটি আইন কাঠামো তৈরি করে, যা কোনোভাবেই সঠিক নয়। কারণ মূলত বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নিমিত্তে ১৯৭৩ সালের আইনটিকেই ২০১০ সালে সংশোধন করে ওই আইন তৈরি করা হয়। ওই আইন অনুযায়ী সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এরকম সব কার্যক্রমই নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা ১৯৯৭ অনুযায়ী, পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকায় বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৩০ মাইক্রোগ্রামের বেশি হতে পারবে না। কিন্তু ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত সালফার ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি মানে শীতকালে হবে ৫৪ মাইক্রোগ্রাম। ইআইএ প্রতিবেদনে প্রকল্প এলাকাকে ‘আবাসিক ও গ্রাম এলাকা’ দেখিয়ে এ অগ্রহণযোগ্য ঘনমাত্রাকে বৈধ করা হয়েছে। ইআইএ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রে বাষ্প দিয়ে টারবাইন ঘোরানো ও শীতলীকরণসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহারের জন্য পশুর নদী থেকে ঘণ্টায় ৯ হাজার ১৫০ ঘনমিটার পানি প্রত্যাহার করে ব্যবহারের পর পানি পরিশোধন করে ঘণ্টায় ৫ হাজার ১৫০ ঘনমিটার হারে নদীতে ছেড়ে দেওয়া হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ফলে প্রকল্প এলাকার ধান, মাছ ও গৃহপালিত প্রাণিসম্পদ ধ্বংস হবে। বিভিন্ন ধরনের নির্মাণকাজ, ড্রেজিং, বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ও তৈল নিঃসরণের ফলে পশুর ও মাইদারা নদী, সংযোগ খাল, জোয়ারভাটার প্লাবনভূমি ইত্যাদি মাছের চলাচল ও প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে (ইআইএ প্রতিবেদন ২৬৬, ২৬৭)। প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ৪৭ লাখ ২০ হাজার টন কয়লা পুড়িয়ে ৭ লাখ ৫০ হাজার টন ফ্লাই অ্যাশ ও ২ লাখ টন বটম অ্যাশ উৎপন্ন করবে। এ বিষাক্ত ছাই পরিবেশ নির্গত হলে মারাত্মক দূষণ ঘটাবে (পৃ. ২৮৭)। ইআইএ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশুর ও মাইদারা নদী হচ্ছে গাঙ্গেয় ও ইরাবতী ডলফিন এবং কুমিরের আবাসস্থল। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য কয়লা পরিবহন ও তেল নিঃসরণের ফলে এসব মহাবিপন্ন জলজ প্রাণীদের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে (পৃ. ২০৭ ও পৃ. ২০৯)। ইআইএ প্রতিবেদনে এরকম যতটুকু হিসাব ও উপাত্ত আছে যদি তার অর্ধেকেরও কম রাসায়নিক দূষণ ঘটে, তাতেই সুন্দরবন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। কারণ বয়সে নবীন জোয়ারভাটার এ ম্যানগ্রোভ অরণ্য খুবই সংবেদনশীল। শালবন, জলাবন, বর্ষারণ্যের মতো দেশের অন্যান্য অঞ্চলের প্রাচীন বনভূমি বাস্তুসংস্থানের মতো সুন্দরবনের টিকে থাকার প্রতিবেশীয় শর্ত ও কারিগরি একেবারেই আলাদা।
বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ২১ মে সুন্দরবনকে দেশের প্রথম রামসার এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য পর্ষদের ২১তম সভায় ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর সুন্দরবনকে ৫২২তম ‘বিশ্ব ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবনের নীলকমলে বিশ্ব ঐতিহ্য ফলক আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি ডলফিন সুরক্ষায় সুন্দরবন অঞ্চলে ডলফিন অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বন অধিদফতর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে এ প্রকল্প সম্পর্কে চিঠিতে জানায়, কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট স্থাপন করা হলে সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার তথা সমগ্র জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হবে। সুন্দরবন কেবল বাংলাদেশের কোনো একক ‘সম্পদ’ বা অঞ্চল নয়। এর বৈশ্বিক আবেদন অনেক বেশি। কারণ পৃথিবীর এক গুরুত্বপূর্ণ কার্বন-শোষণাগার হিসেবে এটি পৃথিবীর টিকে থাকার শর্তের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যে ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশ এ প্রকল্পে অংশীদার হয়েছে সেই এনটিপিসি ভারতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুমোদন পায়নি। ভারতের পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংক্রান্ত দেশীয় আইন সেখানে এনটিপিসির বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ (সিবিডি ১৯৯২), রামসার ঘোষণা, বিশ্ব সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সুরক্ষা সনদ ১৯৭২ স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ কি ভারত কেউই এসব সনদ ও নীতি মানছে না। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনকে হত্যার জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়নের নামে এক ‘বাণিজ্য দৃষ্টিভঙ্গিকে’ লেলিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের আইন ও নীতির মাধ্যমেই এ প্রকল্প সুন্দরবন অঞ্চল থেকে বাতিল করা দরকার। সারাদেশ ফুঁসছে। সুন্দরবন সুরক্ষায় সম্মিলিত হচ্ছে মানুষ দীর্ঘ এক গণপদযাত্রায়। নয়াউদারবাদী বিদ্যুৎ বাহাদুরির মারদাঙ্গা থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এ লড়াইয়ে আপনিও শামিল হোন।

গবেষক
প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ
animistbangla@gmail.com