পিলখানা হত্যাকাণ্ড

সুপ্রিম কোর্টের জন্য চ্যালেঞ্জ…মিজানুর রহমান খান

১৫২ জনের ফাঁসির রায় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ বয়ে এনেছে। হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এটি হবে একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা। অন্যান্য দণ্ডিতের চেয়ে যাঁরা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন, তাঁদের জন্য নিয়মকানুন একেবারেই আলাদা। বিশেষ করে ১৫২ জনের জন্য গতকাল কেবল প্রাথমিক রায় হয়েছে বলে গণ্য হবে। সংবিধানমতে, হাইকোর্ট বিভাগ তাঁদের জন্য দেওয়া রায় যতক্ষণ নিশ্চিত না করবেন, ততক্ষণ তা কার্যকর করা যাবে না। কেউ আপিল না করলেও কারও ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা যাবে না। আইনের দৃষ্টিতে প্রয়োজনে এখানে হতে পারে নতুন বিচার। যেমন, অনধিক ২০ জন পলাতকের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তাঁরা আপিল না করলেও আদালত নির্দোষ মনে করলে তাঁদের বেকসুর খালাস দেবেন।
কেবল আইন নয়, কোনো নতুন তথ্য ও সাক্ষ্যও হাইকোর্ট প্রয়োজনে বিবেচনায় নিতে পারবেন। এমনকি ডাল-ভাতসংক্রান্ত বা অন্য যেকোনো পর্যবেক্ষণ হাইকোর্ট মনে করলে শোধরাতে বা রহিত করতে পারবেন।
আর সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীর কারণে ১৫২ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত একটি বিশেষ আইনি প্রতিকারও পাবেন। সেটা হলো, আগে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে অধিকারবলে আপিল করা যেত না। লিভ মঞ্জুর হলেই কেবল আপিল বিভাগে আপিল করা যেত। এখন হাইকোর্টের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে প্রত্যেক দণ্ডিত তাঁদের সাংবিধানিক অধিকারবলে আপিল করতে পারবেন।
তাই কতটা কম সময় নিয়ে এই মামলার আপিলের শুনানি হাইকোর্টে সম্পন্ন করা যাবে, সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। শুনানি শুরু করতে মূল বাধা হতে পারে পেপারবুক তৈরি করা। পেপারবুক ছাড়া মামলার শুনানি শুরু হবে না। আইনে এটা তৈরিতে কোনো সময়সীমা নেই। বিলম্ব হওয়া সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটা অভ্যাসগত বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি মামুলি হত্যা মামলার পেপারবুক তৈরিতে চার থেকে পাঁচ বছরও সময় নেওয়ার নজির আছে।
তাই সুপ্রিম কোর্টের তরফে দুটি করণীয় থাকবে: লাল কাপড়ে বাঁধা কাগজপত্র পাওয়ামাত্রই পেপারবুক তৈরি করতে প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ। এবং একটি স্বতন্ত্র বেঞ্চ গঠন। বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের তিনটি দ্বৈত বেঞ্চ ডেথ রেফারেন্স শুনানি গ্রহণ করছেন। প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের সামনে একটি সাংবিধানিক বিকল্প থাকছে। তিনি পিলখানা বিদ্রোহের গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে ওই তিনটি নিয়মিত বেঞ্চের বাইরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি পৃথক দ্বৈত বেঞ্চ গঠন করে দিতে পারেন। অন্যদিকে সরকারকে দক্ষ ও অভিজ্ঞ আইন কর্মকর্তাদের দিয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসিকিউশন টিম গঠন করতে হবে।
ঢাকা ল রিপোর্ট ডিএলআরের সম্পাদক মো. খুরশীদ আলম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণত কোনো মোশন বেঞ্চে সংশ্লিষ্ট ডেথ রেফারেন্স মামলার আইনজীবী এক বা দুই মাস সময়ের মধ্যে পেপারবুক প্রস্তুতির নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে দরখাস্ত করেন। তাঁর মতে, বিজি প্রেস থেকে এত বড় পেপারবুক তৈরি করতে দিন-রাত পরিশ্রম করলেও কমপক্ষে ছয় মাস লাগতে পারে।’
এ ধরনের দরখাস্ত এবং তার ওপর আদালতের নির্দেশ ছাড়া দ্রুত পেপারবুক তৈরির নজির বিরল। এই মুহূর্তে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরই এ ধরনের দরখাস্ত করতে উদ্যোগী হতে পারে। অন্যদিকে, অনেক অভিযুক্ত অর্থাভাবে নিম্ন আদালতে আইনজীবী নিয়োগ করতে সমস্যায় পড়েন। ১৯৬০ সালের এলআর ম্যানুয়ালে ফাঁসির আসামিদের জন্য বিধান রয়েছে। এতে বলা আছে, যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় খরচায় আইনজীবী নিয়োগ করে আপিল করতে তাঁরা অধিকারী হবেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কেউ যাতে আইনজীবী দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৪১০ ধারা অনুযায়ী রায় প্রদানের ৬০ দিনের মধ্যে আপিল করা যাবে। আসামিরা একক, যৌথ বা গ্রুপভিত্তিক আপিল করতে পারবেন। আইনমতে, ১৫২ জনই সরকারি খরচায় পূর্ণ রায়ের কপি পাবেন। এর সার্টিফায়েড কপি পাওয়া থেকে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল হবে। তবে এর পরও আপিল করা যাবে। তাঁরা তামাদি আইনে প্রতিকার পাবেন। ১৯০৮ সালের তামাদি আইনের ৫ ধারায় বলা আছে, বিলম্বের কারণের উপযুক্ত ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হলে হাইকোর্ট তাঁর প্রতিকার দিতে পারেন।
খালাস পাওয়া ১৭১ জনের ব্যাপারেও আপিল করা হবে। তাতে কাজের পরিধি আরও বাড়বে। রাজনৈতিক সুবিধা লাভের অভিযোগ তুলেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আগে থেকেই বলে আসছে, জবরদস্তি জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। ন্যায্য বিচারের শর্ত পূরণ হয়নি।
২৭ মাসে ১৫২ জন পেলেন প্রাথমিক দণ্ড। এই চূড়ান্ত রায় পেতে কত দিন লাগবে, তা এই রাষ্ট্রের নিয়মকানুন দেখে নির্দিষ্ট কোনো অনুমান করা যাবে না। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথারীতি ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়া দেখালেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে বিএনপি প্রায় অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছে। গতকালের রায় সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করে পিন্টুর দিকে তাকিয়ে বলেছেন, তাঁর যাবজ্জীবনের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষোভ। তাঁকে মামলায় জড়ানোটিই নাকি ‘গভীর ষড়যন্ত্র’। আগামী ছয় মাসে নতুন নির্বাচিত সরকার আসবে। সরকার সহযোগিতা না করলে দ্রুত বিচার অসম্ভব।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com