সুবহানের বিরুদ্ধে আট শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যাসহ ৯ অভিযোগ

জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে একাত্তরে আট শতাধিক ব্যক্তিকে হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ৯টি ঘটনায় জড়িত থাকার তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত প্রতিবেদনও তৈরি করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল করার জন্য আজ রবিবার প্রসিকিউশন টিমের কাছে জমা দেওয়া হবে। প্রসিকিউশন তা যাচাই-বাছাই করে ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) আকারে দাখিল করবে।
তদন্ত সংস্থার ধানমণ্ডি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান ও জ্যেষ্ঠ সদস্য এম সানাউল হক গতকাল এসব তথ্য জানান। গতকাল শনিবার অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা আবদুস সুবহানের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করার ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন তথ্য জানানো হয়। এ সময় তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূর হোসেন উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত সংস্থা একটি গণহত্যা, সাতটি হত্যা ও একটি নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে মাওলানা সুবহানের জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় পাবনার সুজানগর থানার সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে মদন, চেতনা, রতনা, সমীর কুমার সাহা, বাসু সাহা, রওশন, মহিউদ্দিন, আলমসহ আট শ নারী-পুরুষকে হত্যা, তাদের বাড়িঘর লুট ও আগুন দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব গণহত্যা, হত্যা ও নির্যাতনে প্রত্যেক ঘটনার সঙ্গে লুটপাট, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও স্থানীয় রাজাকার, আলবদর বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে মাওলানা সুবহান এসব অপরাধ সংঘটন করেন বলে অভিযোগ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে গত বছরের ১৫ এপ্রিল তদন্ত শুরু হয়। গত ১২ সেপ্টেম্বর তদন্ত শেষ হয়। এসব অভিযোগ বিষয়ে ৪৩ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা সুবহানের পরিচিতি তুলে ধরে বলা হয়, তাঁর পুরো নাম আবুল বসর মোহাম্মদ আবদুস সোবহান। বাবা শেখ মো. নইমউদ্দিন, মা নূরানী বেগম। তিনি ১৯৩৬ সালে পাবনার সুজানগরের তৈলকুণ্ডি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছাত্রাবস্থায় তালাবিয়া আরাবিয়া সংগঠনের সদস্য হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। তিনি পাবনা জেলা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা (পাকিস্তান আমলে) আমির ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য। ১৯৭০ সালে পাবনা সদর আসন থেকে এমএনএ নির্বাচনে পরাজিত হন। তবে ‘৭১ সালে তথাকথিত উপনির্বাচনে তিনি এমএনএ নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পাবনা জেলায় গঠিত শান্তি কমিটির সেক্রেটারি ছিলেন তিনি। কিছুদিন পরে ৫ জুলাই গঠিত শান্তি কমিটিতে তিনি ভাইস-প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োজিত হন। পরে তাঁর নেতৃত্বে পাবনা জেলার বিভিন্ন থানায় পিস কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে ইয়াহিয়া সরকারের পতন দেখে গোলাম আযমের সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে পালিয়ে যান।
গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর মাওলানা সুবহানকে বঙ্গবন্ধু সেতুর টোল প্লাজা থেকে গ্রেপ্তার করে টাঙ্গাইল পুলিশ। ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার (শ্যোন অ্যারেস্ট) দেখানো হয়।
মাওলানা সুবহানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
প্রথম. ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তিনি তাঁর সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও বিহারিদের নিয়ে মসজিদে আশ্রয় নেওয়া মোয়াজ্জেম হোসেন, মতলব আহম্মেদ, নাজমুল হক খানসহ স্বাধীনতাকামী লোকদের অপহরণ করে হত্যা করেন।
দ্বিতীয়. ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল তাঁর নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে পাকিস্তান বাহিনী ও রাজকাররা ঈশ্বরদী যুক্তিতলা গ্রামে লুটপাটসহ ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে ইসমাঈল হোসেন, জয়নুদ্দিন মেম্বার, আহসান আলী, হারেছ আলী ও তাইজুদ্দিনকে হত্যা এবং তিনজনকে গুরুতর আহত করে।
তৃতীয়. ১৯৭১ সালের ১৬ মে ঈশ্বরদী অরণখোলা গরুর হাট থেকে দুজনকে অপহরণ করে জেলা পরিষদ ডাক বাংলোয় (ঈশ্বরদী, পাবনায়) নিয়ে নির্যাতন করেন তিনি।
চতুর্থ. ১৯৭১ সালের ২ মে তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঈশ্বরদীর সাহাপুর গ্রামে অসংখ্য বাড়িঘরের মালামাল লুটপাট করে বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং চাঁদ আলী, আক্তার হোসেন, হামেজ উদ্দিন, রজব আলী, সোনা প্রামাণিকসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যা করে।
পঞ্চম. ১৯৭১ সালের ১১ মে তাঁর নেতৃত্বে ও উপস্থিতিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাবনা সদর থানাধীন কুলনিয়া ও দোগাছি গ্রামে সমছুদ্দিন, রাহাতুননেসা, হরিপদ সাহা, চাঁদ আলীসহ সাতজনকে হত্যা এবং কয়েকটি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করে।
ষষ্ঠ. ১৯৭১ সালের ১২ মে তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সুজানগর থানাধীন সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে মদন, চেতনা, রতনা, সমীর কুমার সাহা, বাসু সাহা, বাদল সাহা, ঘুঘড়ি, পুণ্য সাহা, রওশন, মহিউদ্দিন, আলমসহ জ্ঞাত-অজ্ঞাত আট শ ব্যক্তিকে হত্যা (গণহত্যা) করে। বিভিন্ন লোকজনের বাড়িঘরের মালামাল লুট করে বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
সপ্তম. ১৯৭১ সালের ২০ মে তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাবনা সদর থানাধীন ভাড়ারা গ্রামে ১৮ জন নিরীহ লোককে অপহরণ করে। তাদের মধ্যে একজনকে গ্রামের একটি স্কুলে হত্যা করা হয়। অন্য ১৭ জনকে পাবনা সদর নূরপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে আটঘরিয়া থানাধীন দেবোত্তর বাজারের পাশে বাঁশবাগানে গুলি করে হত্যা করা হয়। অন্যদেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
অষ্টম. ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের যেকোনো দিন তিনি রাজাকারদের নিয়ে আতাইকুলা থানাধীন (সাবেক পাবনা সদর থানা) দুবলিয়া বাজার থেকে দুজন স্বাধীনতাকামীকে অপহরণ করে কুচিয়ামাড়া গ্রামে একটি মন্দিরের ভেতরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন।
নবম. ১৯৭১ সালে ৩০ অক্টোবর তিনি রাজাকারদের নিয়ে ঈশ্বরদী থানাধীন বেতবাড়িয়া গ্রামে কয়েকটি বাড়ি লুটপাট করার পর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন এবং চারজনকে তুলে নিয়ে হত্যা করেন।