পেঁয়াজের মজুত যথেষ্ট

সুযোগ বুঝে অতি মুনাফা ব্যবসায়ীদের

বর্তমানে পেঁয়াজের যে মজুত আছে, তা দিয়ে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের চাহিদা মেটানো যাবে। পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ ও আমদানি মূল্য বিবেচনায় নিলে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বাবদ ব্যবসায়ীদের খরচ পড়েছিল বড়জোর ২০ থেকে ৩০ টাকা। কিন্তু বাজারে এখন প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮৫ টাকায়।

খাদ্যনীতি ও গবেষণাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) গত বৃহস্পতিবার পেঁয়াজের দামের এই হঠাৎ উল্লম্ফন নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতে পেঁয়াজের উৎপাদন কমে যাওয়া এবং রপ্তানি মূল্য বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে অধিক মুনাফা করছেন।

‘বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া: নীতিনির্ধারণের জন্য একটি পরিস্থিতির বিশ্লেষণ’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই মাস পেঁয়াজের দর অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার জন্য পেঁয়াজের মোট উৎপাদন ও ভোগ নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর বিভ্রান্তিকর তথ্য অনেকাংশে দায়ী। এ ছাড়া সরকার সঠিক সময়ে দ্রুত পেঁয়াজ আমদানি করতে না পারায় দাম বাড়ছে বলে ইফপ্রি মনে করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেঁয়াজ উৎপাদন খরচ ও আমদানি মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হওয়ায় ব্যবসায়ীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের ৮৬ শতাংশ কৃষক বাজারে বিক্রি করে দেন। আমদানির প্রায় পুরোটাই হয় বেসরকারি খাতে।

ইফপ্রি বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান নির্বাহী আখতার ইউ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশে এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন ও আমদানি পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দাম এত বৃদ্ধির কথা নয়। ভারতে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, সরকার ঘোষিত সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি করে বিক্রি করলে দাম প্রতি কেজি ৫০ টাকার মধ্যে নেমে আসত।

উৎপাদন নিয়ে তথ্যবিভ্রাট: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পেঁয়াজের উৎপাদন নিয়ে দুই ধরনের তথ্য দিচ্ছে। ডিএইর হিসাবে গত ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১৯ লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। আর বিবিএসের হিসাবে ওই বছর পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ১১ লাখ ৫৯ হাজার টন। এর আগের বছরের উৎপাদন নিয়েও এই দুটি সংস্থার তথ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে ইফপ্রির মতে, বিবিএসের হিসাবই বাস্তবতার কাছাকাছি।

বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের গত ১৮ আগস্ট গণমাধ্যমের কাছে বলেছিলেন, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন কত তার সঠিক হিসাব তাঁদের কাছে নেই। গত বুধবার জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ের ৮০ শতাংশ কাজ এখন পেঁয়াজকে ঘিরে।

ঢাকার পাইকারি বাজার শ্যামবাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী শিশির দে গতকাল শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে প্রতি কেজির দর ৮০ টাকা পড়ছে। তাই বাধ্য হয়ে আমরা বেশি দামে বিক্রি করছি।’

ইফপ্রির হিসাবে, দেশে গত এপ্রিলে নতুন পেঁয়াজ উঠেছে। এ বছর সব মিলিয়ে প্রায় আট লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। বছরে পেঁয়াজের উৎপাদন ৭ শতাংশেরও বেশি হারে বাড়ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ভারত থেকে মোট পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত আমদানি হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার টন।

এদিকে দেশে গড়ে প্রতি মাসে পেঁয়াজের চাহিদা এক লাখ ২০ হাজার টন। এর মধ্যে নভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই তিন মাসে পেঁয়াজের চাহিদা বেশি থাকে। এ ছাড়া রমজান মাস ও ঈদুল আজহার সময়ে পেঁয়াজের চাহিদা বেড়ে মাসে দেড় লাখ টনের মতো হয়।

দেশে উৎপাদন, আমদানি ও ভোগ হিসাব করলে এখনো দেশে সাড়ে পাঁচ থেকে সাড়ে ছয় লাখ টন পেঁয়াজ মজুদ থাকার কথা। এই মজুদ আছে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছে। ইফপ্রির গবেষকদের মতে, আগামী দুই-তিন মাস পেঁয়াজ আমদানি কম হলেও এই মজুদ দিয়েই এ সময়ে দেশের চাহিদা মেটানো যাবে। বর্তমানে বাজারে যে পেঁয়াজ আছে তার অধিকাংশ জুলাই ও আগস্টে আমদানি করা। তখন ভারতে প্রতি টন পেঁয়াজের দাম ছিল সর্বোচ্চ ২৫০ মার্কিন ডলার। আগস্টের মাঝামাঝি তা করা হয় ৪৫০ ডলার। তবে ওই সময় আমদানি কম ছিল।