সেনাবাহিনী ছাড়াই নির্বাচন থাকছে না বিদ্রোহী প্রার্থী

সেনাবাহিনী ছাড়াই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থিতার পথ রুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধে দন্ডিতদের নির্বাচনে অযোগ্য করে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) সংশোধনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সরকারি দল আওয়ামী লীগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জুলাই মাসে বিদ্রোহী প্রার্থীর পথ রুদ্ধ করে খসড়া প্রস্তাবনা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এর আগে ২০১২ সালের নভেম্বরে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে শুধু আওয়ামী লীগ মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহী ব্যক্তিদের প্রার্থী না করার বিধান রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়। সে অনুযায়ী ইসি আরপিওর খসড়া চূড়ান্ত করে। সোমবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) আইন ২০১৩-এর খসড়া ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইয়া এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানান।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে বলা হয়েছিল, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হবেন। সংশোধিত আইনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজাপ্রাপ্তদেরও এর আওতায় আনা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের মামলায় দন্ডিত যারা আপিল করেছেন তাদের ক্ষেত্রে এ আইন প্রযোজ্য হবে কিনা জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ বিষয়ে খসড়ায় কিছু বলা হয়নি। এর আগে বাহাত্তরের দালাল আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সাজাপ্রাপ্তদের ভোটার হওয়ার পথ বন্ধ করতে ২ সেপ্টেম্বর   ভোটার তালিকা আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হয়। রায়ে এ পর্যন্ত ছয়জনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, যাদের চারজনের মৃত্যুদ- হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ-প্রাপ্ত জামায়াত নেতা গোলাম আযম, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, মোঃ কামারুজ্জামান ও আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মধ্যে শেষ ব্যক্তি ছাড়া সবাই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, আরপিও সংশোধন করে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের জামানত ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়সীমাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে। এ আইন পাস হলে আসন্ন নির্বাচনে একজন প্রার্থী ২৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন, আগে যা ১৫ লাখ টাকা ছিল। তবে দলীয় প্রধানদের নির্বাচনী ভ্রমণ এ ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে না বলে সচিব জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলে ব্যক্তির অনুদান সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ লাখ টাকা করা হয়েছে। আর সংস্থার অনুদানের ক্ষেত্রে এ সীমা ২৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

ইসি থেকে পাঠানো প্রস্তাবে আরপিওর ২ নম্বর ধারার (ক) (৬) প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংজ্ঞা পরিবর্তন ও ১৬ নম্বর ধারা (ক) পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরে প্রতীক বরাদ্দের জন্য দল যাকে চূড়ান্ত করবে, তিনিই হবেন একমাত্র দলীয় প্রার্থী। বাকিদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার হয়েছে বলে গণ্য হবে। তবে দলের সম্মতি নিয়ে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর নির্বাচন কমিশন দলের কাছে জানতে চাইবে যে, বৈধ প্রার্থীদের মধ্যে কে প্রতীক পাবেন। দল একজনকে প্রতীক বরাদ্দের সুপারিশ করবে। অন্যদের বৈধ মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে কেউই বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। কারণ ওই প্রার্থীদের পক্ষে তখন স্বতন্ত্র প্রার্থীর শর্ত পূরণ করা আর সম্ভব হবে না।

ইসি থেকে পাঠানো আরপিওর আইনশৃংখলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে রাখা হয়নি। মন্ত্রিসভাও সেভাবেই রেখে দিয়েছে। ইসি বলছে, সংবিধানের ১২০ ও ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনী কাজে যাদের সহায়তা চাওয়া হবে তারাই সহায়তা করতে বাধ্য থাকবে। এজন্য সেনাবাহিনীকে স্পষ্ট করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

এদিকে ২০০১ ও ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধান অনুযায়ী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র   বাহিনীর নাম বাদ দেয়। এখন নির্বাচনকালীন আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় আছে পুলিশ, আর্মড, পুলিশ ব্যাটালিয়ন, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ড।

আরপিও প্রস্তাবনায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হলে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর নেয়া, প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকায় উন্নীতকরণ, নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ব্যয় বৃদ্ধি করা, নির্বাচনী আচরণবিধির শাস্তির বিষয়টি সংশোধন করা, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অপরাধের জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তির বিধান করার বিষয় রয়েছে। বর্তমানে জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয় ১৫ লাখ টাকা। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংস্কারে এ নির্বাচনী ব্যয় বাড়িয়ে ২৫ লাখ টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভোটারপিছু ব্যয় ৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা করা হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচের পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে কোনো দলের প্রার্থী সংখ্যা ২০০’র বেশি হলে ওই দল সাড়ে ৪ কোটি টাকা খরচ করতে পারে। এ খরচের পরিমাণ দেড় কোটি বাড়িয়ে ৬ কোটি করা হচ্ছে। প্রার্থী ২০০’র কম হলে বর্তমানে দল খরচ করতে পারে ৩ কোটি টাকা। এ ব্যয়ের পরিমাণ ১ কোটি বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করা হচ্ছে। কোনো দল নির্বাচনে ১০০’র কম প্রার্থী দিলে দেড় কোটি টাকা খরচ করতে পারে। এ খরচের পরিমাণ ৩ কোটি টাকা করা হচ্ছে। ৫০ জনের কম প্রার্থী দিলে দল খরচ করতে পারে ৭৫ লাখ টাকা। আসন্ন নির্বাচনে এ খরচের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হচ্ছে। ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনতে কোন দল কোন প্রার্থীর পেছনে কোন খাতে কত টাকা দিয়েছে তাও জানাতে হবে কমিশনকে। পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত খরচের পরিমাণ ভোটারভেদে ৫০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা রয়েছে। এ খরচও দ্বিগুণ করা হচ্ছে।

এছাড়া নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের মধ্য থেকে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির বিষয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে যদি কোনো অনুশাসন দেয়া হয় তাহলে তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। নির্বাচনী মামলা করতে আগে ২ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হতো। এখন তা বাড়িয়ে পাঁচ হাজার টাকা করা হয়েছে। আরপিও অনুসারে কেউ ঋণখেলাপি হলে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের অপরাধের জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তি হিসেবে স্ট্যান্ড রিলিজের বিধান রাখা, নির্বাচন-পরবর্তী ১ মাস নির্বাচনী কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা, প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় যাচাইয়ে মনিটরিং কমিটি রাখা, তৃণমূল থেকে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়টি প্রমাণসহ যাচাই করা, মনোনয়ন পেতে দলে ৩ বছর থাকাটা বাধ্যতামূলক করা, নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক ভিডিও ক্যামেরা রাখা, নিবন্ধিত দলগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আসনে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোট পাওয়ার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা, আচরণবিধি লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি ৬ মাস কারাদ- ৫০ হাজার টাকা জরিমানার স্থলে ২ বছর কারাদ- ২ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা, প্রতিটি আসনে কমিশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষক থাকা, প্রার্থীর প্রচারণামূলক পোস্টারে প্রেসের নাম ও মুদ্রণকৃত পোস্টারের সংখ্যা উল্লেখ করাসহ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে আসছে ব্যাপক পরিবর্তন।

আরপিওর ৮৬(এ) ধারা সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি যথাযথ কারণ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের দেয়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সেই ব্যক্তির সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদ- বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় ধরনের দ- হবে।

৮৬(বি) ধারায় আছে, কোনো প্রতিষ্ঠান কমিশনের দেয়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ব্যক্তি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে বিবেচিত হবে। এ সম্পর্কিত ব্যাখ্যায় প্রতিষ্ঠান বলতে যে কোনো ধরনের সরকারি বা আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠান, নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি প্রতিষ্ঠান এবং যে কোনো ধরনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে বোঝানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদ- বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দ-ের কথা বলা হয়েছে।

আরপিওর ৪৪(ই) ধারা সংশোধনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ না করে সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় কোনো ধরনের বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার মতো অন্য কোনো সিদ্ধান্তও মন্ত্রণালয় নিতে পারবে না। উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ অধিবেশন শুরু হয় ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। সে অনুযায়ী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে-