স্বাধীন হতে চায় পুলিশ

বাহিনী নয়, আলাদা বিভাগ চায় পুলিশ। সেটির নাম হবে ‘পুলিশ বিভাগ’। আর এ পুলিশ বিভাগের প্রধান হিসেবে যিনি থাকবেন তাঁর পদবি হবে ‘চিফ অব পুলিশ’। পুলিশে নিয়োগ, বদলি থেকে শুরু করে সব কিছুই হবে চিফ অব পুলিশের নির্দেশে। পুলিশের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসন চিফ অব পুলিশের ওপর ন্যস্ত থাকবে। এ ছাড়া পুলিশের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ নিয়ে আদালতে যাওয়া যাবে না। কোনো পুলিশ সদস্য বিদ্রোহে জড়ালে তাঁকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। এসব প্রস্তাবের পাশাপাশি বিশেষ কোনো কাজ করার জন্য পুলিশের তরফ থেকে ‘বিশেষ পুলিশ’ নিয়োগের বিধান রেখে ‘বাংলাদেশ পুলিশ আইন ২০১৩’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। খসড়ায় অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিচার করার জন্য পুলিশ বিভাগে ম্যাজিস্ট্রেট সংযুক্তির কথাও বলা হয়েছে।
বিদ্যমান পুলিশ আইনের সঙ্গে অনেক নতুন বিষয় যুক্ত করে নতুন পুলিশ আইনের খসড়া তৈরি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রস্তাবিত আইনটি গত এপ্রিলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। চার মাস পেরিয়ে গেলেও আইনটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যতটুকু জানি, এটি পর্যালোচনার পর্যায়ে আছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাসখানেক আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হুমায়ূন কবীরকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি পৃথিবীর কয়েকটি দেশের পুলিশ আইন সংগ্রহ করেছে। সেসব দেশের আইনে কী কী বলা আছে তা খতিয়ে দেখছে তারা। পুলিশের দেওয়া খসড়া ও অন্য দেশের আইন দেখে আরেকটি খসড়া তৈরি করছে ওই কমিটি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, পুলিশের প্রস্তাবিত আইনের খসড়াটিতে মতামত দেওয়ার জন্য এটি জনপ্রশাসন, আইন, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সাত-আটটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনেও পাঠানো হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যা করলে জনগণের মঙ্গল হয়, তা-ই করা হবে। দেখা যাক, মন্ত্রণালয়গুলো কী মতামত দেয়।’
আইনটির ৮ ধারার উপধারা-১-এ বলা হয়েছে, ‘এই আইনের বিধান সাপেক্ষে বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসন চিফ অব পুলিশের উপর ন্যস্ত থাকবে।’
৬ ধারার উপধারা-১-এ বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ পুলিশের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব সরকারের উপর ন্যস্ত থাকবে এবং এই আইনের বিধানের সঙ্গে সংগতিহীনভাবে সরকার কোন ব্যক্তি, কর্মকর্তা, কর্তৃপক্ষ বা আদালতকে কোন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার ক্ষমতা দিবে না।’ ৪৮ ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ প্রতিষ্ঠানের সদস্য থাকাকালীন কোন পুলিশ সদস্য তার কর্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলে, নিয়মিত দায়িত্ব পালন বিঘি্নত না হলে চিফ অব পুলিশের অনুমোদন নিয়ে দ্বিতীয় কোন পেশায় কাজ করতে পারবেন।’
৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীনে অপরাধসমূহের বিচার কোড বিধৃত সংক্ষিপ্ত বিচার পদ্ধতিতে করিবার নিমিত্তে পুলিশ ইউনিটে প্রয়োজনীয় ম্যাজিস্ট্রেট সংযুক্তির ব্যবস্থা থাকিবে।’ ৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধি, জননিরাপত্তা বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাহা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সরকার একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ পুলিশ ডিভিশন গঠন করিবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পদবি বদলে চিফ অব পুলিশ করা যেতে পারে। অন্য চাকরির সুবিধা দেওয়া হলে পুলিশকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দেওয়া হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। তাদের বিরুদ্ধে দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ বিস্তর। এই স্বাধীনতা পেলে আরো বেশি করে দায়িত্বে অবহেলা করবে তারা।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিদ্রোহের বিষয়টি থাকা অবশ্যই উচিত। সর্বোচ্চ শাস্তি আরো বাড়ানো উচিত বলে আমি মনে করি।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ যে জনগণের বন্ধু, তার প্রমাণ রাখতে পারেনি। আইন করে যদি তাদের ভারসাম্যহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে তারা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠবে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ একটি ডিসিপ্লিনারি ফোর্স। পেশাদারি বাড়ানোর জন্য আলাদা বিভাগ তারা করতে পারে। বাহিনী নিয়ন্ত্রণের সব কিছু যদি তাদের হাতে থাকে, তাহলে তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হিসেবে কাজ করতে পারবে। যে আইন করলে পুলিশের কাছ থেকে জনগণ ভালো সার্ভিস পায়, তা-ই করা উচিত।’
প্রস্তাবিত নতুন আইনের ৬২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের পূর্ব অনুমোদন ব্যতীত (যাহাতে অপরাধ সম্পৃক্ত ঘটনাবলির বিবরণ থাকিবে) কোন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কোন আদালতে বিচারার্থে গ্রহণ করা হইবে না।’ উপধারা-২-এ বলা হয়েছে, ‘নালিশী কাজ সংঘটনের তারিখ হইতে ছয় মাসের মধ্যে দায়ের করা না হইলে কোন আদালত কোন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে এই আইনের অধীন কর্তৃত্ব প্রয়োগে বা কর্তব্য সম্পাদনকালে অথবা কর্তব্যের আবরণে কৃত কোন অন্যায় বা অপরাধের অভিযোগে কোন মামলা গ্রহণ করিবে না।’
৬০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ-সংক্রান্তে চিফ অব পুলিশ অথবা ক্ষেত্র মতে, ইউনিটপ্রধান অনুসন্ধান সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। পুলিশ সদস্যগণের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার সম্বলিত লিখিত অভিযোগের বিষয়ে চিফ অব পুলিশ কর্তৃক নির্ধারিত সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এ রয়েছে যে, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে হলে তাদের অনুমোদন লাগবে। এ ছাড়া সংবিধানে রয়েছে, ক্রিমিনাল অফেন্সের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় আদালতে যাওয়া যাবে। যদি নতুন পুলিশ আইনটি পাস করা হয়, তাহলে দুদক আইন ও সংবিধানের সঙ্গে তা সাংঘর্ষিক হবে।’
প্রস্তাবিত আইনটির ৪৮ ধারায় বলা হয়েছে, “পুলিশ কমিশনার, জেলা পুলিশপ্রধান কিংবা চিফ অব পুলিশের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন পুলিশ কর্মকর্তা বিশেষ প্রয়োজনে সরকারের পূর্বানুমতি সাপেক্ষে সুস্থ, সবল এবং কর্মক্ষম কোন ব্যক্তিকে ‘বিশেষ পুলিশ অফিসার’ হিসেবে নিয়োগ দিতে পারিবেন।” এ ধারার উপধারা-২-এ বলা হয়েছে, ‘বিশেষ পুলিশ অফিসার হিসেবে নির্বাচিত প্রতিটি সদস্যকে একটি নিয়োগপত্র ইস্যু করা হইবে, তাহাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হইবে এবং তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বুঝাইয়া দেওয়া হইবে।’ আইনের ৫০ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সরকারের পূর্বানুমোদনের ভিত্তিতে চিফ অব পুলিশ বিশেষ পুলিশ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্যগণের কর্তব্যকাল নির্ধারণ করিবেন। তবে তাহা কোনক্রমেই একাদিক্রমে দুই বছরের অধিক হইবে না।’
জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশেষ পুলিশের বিষয়টি ১৮৬১ সালের অধ্যাদেশেই রয়েছে। নতুন কিছু নয়।’
খসড়া আইনের ৯ ধারায় বলা হয়েছে, ‘ইন্সপেক্টর জেনারেলগণের মধ্য হইতে একজনকে সরকার চিফ অব পুলিশ হিসেবে নিয়োগ প্রদান করিবে এবং চিফ অব পুলিশ সরকারের সাধারণ নিয়ন্ত্রণাধীনে তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবেন।’
আইনটিতে এ কথা বলা হলেও কতজন ইন্সপেক্টর জেনারেল থাকবেন সে বিষয়ে উল্লেখ নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজি শহীদুল হক বলেন, ‘কতজন ইন্সপেক্টর জেনারেল হবে তা সরকার নির্ধারণ করবে।’
১১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘চিফ অব পুলিশ পদাধিকার বলে আইন বা বিধিমতে সরকারের সিনিয়র সচিব বা সচিবকে প্রদত্ত আর্থিক ক্ষমতাসহ এই আইনে বা অন্য কোন আইনে তাহাকে প্রদত্ত সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবেন।’ আরো বলা হয়েছে, ‘চিফ অব পুলিশ এবং ইন্সপেক্টর জেনারেলগণ সমগ্র বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণীর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের পূর্ণ ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী হইবেন। পুলিশি কার্যাবলি সম্পাদনে এইরূপ ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট পর্যন্ত অর্পণ করা যাইবে।’