হল-মার্ক কেলেঙ্কারি

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও পর্ষদের পক্ষে দুদকের সাফাই

হল-মার্ক কেলেঙ্কারির প্রধান হোতা ও গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সম্পর্ক ছিল সামাজিক। এখানে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়নি। এ কারণে তাঁর নাম মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে আসেনি বলে দাবি করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার মো. সাহাবউদ্দিন। একই সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এ বিষয়ে কোনো দায় নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টার বিষয়ে কমিশনার (তদন্ত) মো. সাহাবউদ্দিন আরও বলেন, ‘হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে সংসদীয় উপকমিটির তদন্ত প্রতিবেদন আমরা ভালো করে পর্যালোচনা করেছি। সেখানে স্পষ্ট করে উপদেষ্টার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। আর তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাতে তাঁকে আসামি করা যায় না।’

পরিচালনা পর্ষদের দায় নেই উল্লেখ করে মো. সাহাবউদ্দিন বলেন, সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে (সাবেক শেরাটন) হল-মার্ক যে অর্থ নিয়েছে, তাকে ঋণ বলা যায় না। এটা একধরনের অর্থ লোপাট। এখানে অভিনব কায়দায় জালিয়াতি করা হয়েছে। যেহেতু এটা কোনো ঋণ নয়, সেহেতু এখানে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ ঘটনায় শুধু শাখাপ্রধানদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কমিশনার মো. সাহাবউদ্দিন এসব কথা বলেন। কমিশনার আরও বলেন, কমিশন সংশ্লিষ্ট তদন্ত দলের ওপর সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট। মামলার বিচারিক কার্য পরিচালনার জন্য হল-মার্কের বিরুদ্ধে এই ১১ মামলার অভিযোগপত্র দ্রুত আদালতে পেশ করা হবে।

এর আগে গতকাল হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ১১ মামলায় অভিযোগপত্রের জন্য দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করেছে দুদক কর্তৃপক্ষ। এসব মামলায় মোট ২৫ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

২৫ আসামির মধ্যে আছেন হল-মার্কের এমডি মো. তানভীর মাহমুদ, তাঁর স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম (জামিনে আছেন), তানভীরের ভায়রা ও গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক তুষার আহমেদ, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. জিয়াউর রহমান, আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম, স্টার স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, টি অ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ম্যাক্স স্পিনিং, আনোয়ারা স্পিনিং, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনাল, অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজ ও স্টার স্পিনিং মিলসের মালিকেরা সবাই ভুয়া। কথিত মালিকেরা সবাই হল-মার্কের কর্মচারী। ম্যাক্স ও আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসব ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেছেন।

হল-মার্কের বাইরে অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেন সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) এ কে এম আজিজুর রহমান, সাবেক সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন ও সোনালী ব্যাংক ধানমন্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা। কেলেঙ্কারির সময় মেহেরুন্নেসা ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় কাজ করতেন।

তদন্তে ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবির, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান (দুজনই ওএসডি), জিএম অফিসের দুই মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ননীগোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান (দুজনই ওএসডি), প্রধান কার্যালয়ের দুই উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত) ও মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত), দুই সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত) ও এজাজ আহম্মেদকে অভিযুক্ত করা হয়।

১১ মাস তদন্ত শেষে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এজাহারভুক্ত আট আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন সোনালী ব্যাংকের জিএম ভগবতী মজুমদার, এজিএম মো. আবুল হাসান এবং রূপসী বাংলা শাখার সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা (অব.) মো. ওয়াহিদুজ্জামান।

মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে পাঁচজনের বিরুদ্ধে। তাঁরা হলেন সোনালী ব্যাংকের জিএম আ ন ম মাসরুরুল হুদা সিরাজী ও সবিতা সিরাজ, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. খুরশিদ আলম ও আশরাফ আলী পাটোয়ারী। দায়িত্বে অবহেলার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মতামত দিয়েছে তদন্ত দল। তবে তাঁরা কোনো দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন না।

এজাহারে নাম নেই এমন আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। তাঁরা হলেন প্রধান কার্যালয়ের এজিএম মো. শওকত আলী, ডিজিএম এম এইচ এস আবু জাফর, বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি কাজী ফখরুল ইসলাম, জিএম মো. মাহবুবুল হক ও নওশের আলী খন্দকার, নির্বাহী কর্মকর্তা মো. একরামুল হক মণ্ডল, অবসরে যাওয়া জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিদা খানম, এজিএম শামিম আখতার এবং শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম ও কর্মকর্তা উকিল উদ্দিন।

গত বছরের ৪ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় মোট ২৭ জনের বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছিল। মামলার এজাহার অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে হল-মার্ক মোট দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে।