হচ্ছে হবে করেই ২৮ মাস পার

২০১১ সালের ১৫ মে সাদেক হোসেন খোকাকে আহ্বায়ক ও আবদুস সালামকে সদস্যসচিব করে ২১ সদস্যের ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় ছয় মাসের মধ্যে সর্বস্তরে কাউন্সিলের মাধ্যমে ঢাকা মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি নির্বাচন করার। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে প্রায় আড়াই বছর হতে চলল- এখনো আলোর মুখ দেখেনি মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি। অগত্যা খোকা-সালামের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটির পুরনো ভেলাতেই ভাসছে ঢাকা মহানগর বিএনপি। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রমে নেই কাঙ্ক্ষিত গতি। হতাশা বাড়ছে স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের।
দলের অনেক নেতারই অভিযোগ, কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনেও মহানগর বিএনপির জোরালো ভূমিকা নেই। সাংগঠনিক এবং আন্দোলন দুই ক্ষেত্রেই স্থবিরতা দিন দিন যেন প্রকট হয়ে উঠছে। দলের হাইকমান্ডও এখন এ নেতৃত্বের ওপর বেশ নাখোশ বলে জানা গেছে। তবে এ নিয়ে হতাশ নন আহ্বায়ক কমিটির নেতৃত্বে থাকা খোকা-সালাম।
মহানগর কমিটির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকা কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে একাধিক মামলা
দিয়ে রেখেছে সরকার। পুলিশ অযথা হয়রানি করছে। এর মধ্যেই কমিটি গঠনের কাজ চলছে। যথাসময় কমিটি ঘোষণা করা হবে। তিনি আরো বলেন, দেশের যে অবস্থা, তাতে জনগণ ঘরে বসে থাকতে পারে না। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন চলছে। আগামী দিনে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে, তখন আন্দোলনও জোরদার হবে।
সদস্যসচিব আবদুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সব ঠিকঠাক চলছে। কমিটি যথাসময়ে আসবে। তবে নির্বাচনের আগে আমরা কমিটি দিচ্ছি না।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কমিটি দেওয়া মানেই কিছু মানুষ খুশি হয়, কিছু অখুশি। এ মুহূর্তে আমাদের কাছে যেহেতু আন্দোলনই মুখ্য, তাই আন্দোলন জোরদার করতে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই কমিটি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
এ ব্যাপারে গতকাল শুক্রবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মহানগর কমিটির প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি খুবই অসুস্থ। এখন কথা বলতে পারছি না। এ নিয়ে আরেক দিন কথা বলব।’ তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক নেতা জানান, ঢাকা মহানগর কমিটি নিয়ে খোদ খালেদা জিয়া নাখোশ। কমিটি গঠন নিয়ে খামখেয়ালি চলছে। আজ দিচ্ছি, কাল দিচ্ছি করে কেবল সময় নষ্ট করা হচ্ছে। এর কারণে রাজধানীতে নানা আন্দোলন কর্মসূচি সেভাবে বেগবান করা যাচ্ছে না বলেই দলের নেতা-কর্মীদের বিশ্বাস। দলের সাংগঠনিক শক্তি জোরদার করার স্বার্থেই অবিলম্বে এ কমিটি করা উচিত বলে মনে করেন ওই নেতা।
কমিটি হতে পারে ৩০১ সদস্যের : মহানগর বিএনপির আগের কমিটি ছিল ২৯৪ জনের। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, শেষ পর্যন্ত কমিটি হলে এবার তার আকার বেড়ে হতে পারে ৩০১ সদস্যের। এর মধ্যে ১২০ থেকে ১৩০ জন বিভিন্ন সম্পাদক পদে থাকবেন। অন্যরা সদস্য হিসেবে থাকবেন। কমিটির বেশির ভাগ পদে থাকবেন মহানগরের আগের কমিটির নেতারাই। তবে এবারের কমিটিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদেরও যোগ্যতা অনুযায়ী রাখা হবে।
এ প্রসঙ্গে আবদুস সালাম বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ কমিটি নিয়ে আমরা আহ্বায়ক কমিটির নেতারা কয়েক দিন আগেও মিটিং করেছি। আরো মিটিং হবে। পুরো কমিটি আমরা প্রস্তুত করে রাখতে চাই, যাতে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) চাইলেই দেওয়া যায়।’
বর্তমান অবস্থা : ঢাকা মহানগরের আওতায় রয়েছে ১০০টি ওয়ার্ড, ১৮টি ইউনিয়ন ও ৪৯টি থানা। এসবের মধ্যে বিএনপির পুরনো কমিটি রয়েছে ২, ৩, ৫, ৬, ৭, ৮, ১১, ১২, ১৩, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৯১, ৯২, ৯৭ নম্বর ওয়ার্ডে। নতুন কমিটি হয়েছে ৪, ৯, ১০, ১৪, ১৫, ১৬ ও ২২ থেকে ২৬ পর্যন্ত, ৩২, ৩৩ ও ৩৫ থেকে ৪৩, ৪৫ থেকে ৫৩, ৫৫ থেকে ৭০, ৭২ থেকে ৮৬, ৮৯ ও ৯৪ থেকে ৯৬ এবং ৯৮ থেকে ১০০ নম্বর ওয়ার্ডে। কমিটি হয়নি ১, ৩১, ৩৪, ৪৪, ৫৪, ৭১, ৮৭, ৮৮, ৯০ ও ৯৩ নম্বর ওয়ার্ডে।
১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে বিএনপির কমিটি করা হয়েছে বেরাইদ, সাঁতারকুল, শ্যামপুর, দনিয়া, দক্ষিণখান, উত্তরখান, মান্ডা, ডুমনি, হরি রামপুর, বাড্ডা, ভাটারা ও মেরুলিয়ায়। অন্যদিকে পুরনো কমিটি রয়েছে মাতুয়াইল, ডেমরা ও সারুলিয়ায়। বাকি তিন ইউনিয়নে কোনো কমিটি নেই। থানাগুলোর মধ্যে নতুন কমিটি হয়েছে আদাবর, ভাটারা, বিমানবন্দর, চকবাজার, ধানমণ্ডি, দক্ষিণখান, গেণ্ডারিয়া, হাজারীবাগ, কাফরুল, খিলক্ষেত, কদমতলী, কলাবাগান, নিউ মার্কেট, পল্টন, রামপুরা, রমনা, শাহবাগ, শ্যামপুর, সূত্রাপুর, তুরাগ, উত্তরা পূর্ব, উত্তরা পশ্চিম, উত্তরখান, ভাসানটেক, ডেমরা ও তেজগাঁওয়ে। তবে হাজারীবাগ, চকবাজার, নিউ মার্কেট, ধানমণ্ডি, কলাবাগান, রমনা, শাহবাগ, পল্টন ও কাফরুল থানায় করা হয়েছে আহ্বায়ক কমিটি। পুরনো কমিটির মধ্যে রয়েছে বাড্ডা, গুলশান, কামরাঙ্গীরচর, খিলগাঁও, কোতোয়ালি, লালবাগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মতিঝিল, পল্লবী, সবুজবাগ ও ক্যান্টনমেন্ট থানায়। যেসব থানায় কমিটি হয়নি সেগুলো হচ্ছে- বনানী, বংশাল, দারুস সালাম, যাত্রাবাড়ী, শাহ আলী, শেরে বাংলানগর, শিল্পাঞ্চল, শাহজাদপুর, মুগদা, ওয়ারী ও রূপনগর।
দীর্ঘসূত্রতার নেপথ্যে : কেন আহ্বায়ক কমিটি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করতে পারছে না তা নিয়ে প্রশ্নের অন্ত নেই। জানা গেছে, এ কমিটির নেতাদের মধ্যে নানা বিষয়ে অনৈক্য ও দূরত্ব রয়েছে। দলীয় নেতাদের মতে, খোকা ও সালাম ছাড়া বাকি সদস্যরা যুগ্ম আহ্বায়ক। মহানগর কমিটির আহ্বায়ক সাদেক হোসেন খোকার অন্যতম প্রতিপক্ষ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসপন্থী যুগ্ম আহ্বায়ক রয়েছেন ছয়জন। তাঁরা হলেন সালাউদ্দিন আহমেদ, এস এ খালেক, নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু, আবু সাঈদ খান খোকন, শামসুল হুদা ও সাজ্জাদ জহির। অন্যদিকে খোকার পক্ষে রয়েছেন আবদুস সালাম, কাজী আবুল বাশার, এম এ কাইয়ুম, আনোয়ারুজ্জামান, আবদুল আলীম নকি, মুন্সী বজলুল বাসিত আনজু ও মো. মোহন। বাকিদের সরাসরি কারো পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। জানা গেছে, মহানগর কমিটিতে দুই পক্ষই নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে চায়। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি নন।
তবে এসব কথা মানতে নারাজ সদস্যসচিব আবদুস সালাম। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাসে আমাদের নেতা-কর্মীদের নামে ২০০-এর বেশি মামলা দিয়েছে সরকার। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের নির্বাচনী এলাকায় এখন পর্যন্ত আমরা কর্মিসভা তো দূরের কথা, ঘরোয়া অনুষ্ঠানও করতে পারিনি। তারিখ ঘোষণা করলেই পুলিশ বাধা দেয়। আদাবর থানায় একটি কর্মিসভায় হামলা চালিয়ে পুলিশ ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ ছাড়া যাঁদের দিয়ে কমিটি করা হবে, তাঁদের বেশির ভাগের নামেই মামলা দিয়েছে পুলিশ। তাঁদের কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, কেউ কারাগারে আছেন।
যুগ্ম আহ্বায়ক মুন্সী বজলুল বাসিত আনজু কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা সত্যি অতীতের তুলনায় ঢাকা মহানগরে এবার সরকারবিরোধী আন্দোলন তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, ঢাকা মহানগরের এমন কোনো নেতা নেই, যাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫-১৬টি মামলা নেই। তাঁরা তো ঘরে-বাইরে কোথাও থাকতে পারছেন না। সরকার একটি বিশেষ জেলার পুলিশ কর্মকর্তাদের রাজধানীতে নিয়োগ দিয়েছে। আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজ্জাদ জহির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিটি নিয়ে গত মাসেও ম্যাডামের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হয়েছে। তিনি আন্দোলন-সংগ্রামে সকলকে আরো সক্রিয় হওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।’
প্রসঙ্গত, এর আগে ১৯৯৬ সালে ঢাকা মহানগর বিএনপিকে শক্তিশালী করতে সাদেক হোসেন খোকাকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। পরের বছর তাঁকেই সভাপতি ও আবদুস সালামকে সাধারণ সম্পাদক এবং নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও সালাউদ্দিন আহাম্মেদকে সহসভাপতি করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘদিন মহানগরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন তাঁরা। ওয়ান-ইলেভেনের প্রেক্ষাপটে মহানগর কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত সভাপতি, সম্পাদকসহ বেশ কয়েকজন দলের সংস্কারপন্থীদের কাতারে যোগ দেন। ওই সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ মহানগর কমিটির অনেক নেতা ছিলেন কারাগারে। কেউ পলাতক আবার কেউ নিষ্ক্রিয় ছিলেন। কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ, নেতৃত্বে অযোগ্যতাসহ বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ২০০৭ সালের জুন মাসে মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করেন বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর সংস্কারপন্থীদের অনেকেই আবার দলের পক্ষে কাজ করার আগ্রহ দেখান। দলের বৃহত্তর স্বার্থে খালেদা জিয়াও তাঁদের কাউকে কাউকে সেই সুযোগও দেন। সংস্কারপন্থী হয়ে দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয় দখলসহ বড় বড় ঘটনার নেতৃত্ব দেওয়া ওই নেতাদের খালেদা জিয়া ক্ষমা করলেও খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর অনুসারীরা তাঁদের মেনে নেননি। এ জন্য দেলোয়ার হোসেন মহাসচিবের দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত ঢাকা মহানগর কমিটি গঠনের কার্যক্রমই শুরু করা সম্ভব হয়নি বলে অনেকে মনে করেন।