হরতালে নেতারা ঘরে ক্ষুব্ধ খালেদা জিয়া

হরতালের আগে নানা রকম হুংকার দিলেও রাজধানীতে কার্যত অদৃশ্যই রয়ে গেছেন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। এমনকি মহানগরের নেতারাও অনুপস্থিত দৃশ্যপটে। নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বরাবরের মতো ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে কয়েকজন মধ্যম সারির নেতা ও কর্মী অবস্থান করলেও সিনিয়র নেতাদের কোনো খোঁজ নেই। আন্দোলনের এই চরম মুহূর্তেও দলের সিনিয়র নেতারা মাঠে নামেননি। এবারও ঘরে বসেই হরতাল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এই বড় নেতারা। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাদের মধ্যে ক্ষোভের অন্ত নেই। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, জ্যেষ্ঠ নেতাদের এমন নিষ্ক্রিয়তা দেখে স্বয়ং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও তাঁদের প্রতি যথেষ্ট বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

বরাবরের মতো এবারো হরতাল চলাকালে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় অলিগলির মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে মিছিল বের করেছে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তবে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে কয়েকটা ককটেল ফাটিয়েই তারা আবার গলির ভেতরে ঢুকে হারিয়ে যায়। সরকারবিরোধী কঠোর আন্দোলনের এই পর্যায়ে দলের শীর্ষ নেতাদের মাঠে না থাকায় হতাশ তৃণমূলের অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক কমিটির কেউ মাঠে নেই। মহানগরীর ১০০টি ইউনিটের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা কোথায়?

দলীয় সূত্র জানায়, হরতালে যখন দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারদলীয়দের সঙ্গে সংঘর্ষে নেতা-কর্মীরা প্রাণ হারাচ্ছেন, সেখানে রাজধানীতেই দলের শীর্ষ নেতারা মাঠে না থাকায় নাখোশ দলীয় প্রধান। এ ছাড়া হরতালে নয়াপল্টনের কার্যালয়ের নিচে এভাবে অবস্থানের বিষয়েও খালেদা জিয়া খুশি নন।

সূত্র আরো জানায়, গত সপ্তাহে এক শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর গুলশানের কার্যালয়ে দেখা করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে ১৮ দলীয় জোটের বিষয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে বিএনপির তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মতপ্রকাশ করেন। এ সময় খালেদা জিয়া কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘কই হরতালে তো আপনাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখছি না। এখানে কথা না বলে রাজপথে থাকেন। জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের দাবি আদায়ে কাজ করুন।’ চেয়ারপারসনের এসব কথার কোনো জবাব দিতে না পেরে ওই নেতা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে যান বলে জানা গেছে।

গত ২৫ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জোটের সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়া ২৭, ২৮ ও ২৯ অক্টোবর টানা ৬০ ঘণ্টা হরতালের ঘোষণা দেন। ওই হরতালে ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ, বোমাবাজি হলেও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের রাজপথে দেখা যায়নি। এবারের হরতালেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। তিন দিনের হরতালে গতকাল ছিল দ্বিতীয় দিন। গতকাল পর্যন্ত মাঠে বিএনপির নেতা-কর্মীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না। বিচ্ছিন্নভাবে নগরীর কয়েকটি স্থানে নেতা-কর্মীরা পিকেটিং করেন। তবে সংখ্যায় তাদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। পাড়া-মহল্লায় পিকেটিংয়ের চেষ্টা করলেও পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যেতে হচ্ছে নেতা-কর্মীদের। তাদের মতে, সিনিয়র নেতারা মাঠে থাকলে পুলিশ তাদের ধাওয়া কিংবা লাঠিচার্জ করতে সাহস পেত না। কিন্তু সিনিয়র নেতারা সারাক্ষণ গ্রেপ্তারের ভয়ে থাকেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের নেতা-কর্মীরা মন্তব্য করেছেন।

নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আগের মতো গতকালও পুলিশ মোতায়েন ছিল। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী, মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আব্দুস সালাম ছাড়া অন্য নেতাদের এ দিন সেখানে দেখা যায় না।

সূত্র জানায়, গত ৩০ অক্টোবর রাতে গুলশানের কার্যালয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয় ৪ থেকে ৬ নভেম্বর সারা দেশে রাজপথ, রেলপথ, নৌ ও সড়কপথ অবরোধ কর্মসূচি দেওয়ার। ওই সময় খালেদা জিয়া মন্তব্য করেন, ‘তিন দিনের (২৭, ২৮, ২৯ অক্টোবর) হরতাল হয়ে গেল। ওই হরতালে দলের সিনিয়র নেতা তো দূরের কথা, জোটের নেতারাও মাঠে ছিলেন না। তাই হরতালের পরিবর্তে অবরোধ দেওয়াই ভালো। অবরোধ হলে নেতাদের মাঠে থাকতে হবে।’ পরে অবশ্য কর্মসূচি চূড়ান্ত করার ভার খালেদা জিয়ার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়। পরের দিন ৩১ অক্টোবর ১৮ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। জোট নেতারাও চেয়ারপারসনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, এই মুহূর্তে অবরোধ দিলে নেতারা মাঠে থাকলে গ্রেপ্তার হতে পারেন। তাই অবরোধের চেয়ে আপাতত হরতালই ভালো। বৈঠকের পর বিএনপি ও জোট নেতারা আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং না করে ১ নভেম্বর ১৮ দলীয় জোটের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর কর্মসূচি ঘোষণার কথা বলেন। কিন্তু হরতাল না অবরোধ এ নিয়ে বিএনপি ও জোটের মধ্যে দেখা দেয় মতপার্থক্যে। এ কারণে মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক এক দিন পিছিয়ে শুক্রবারের পরিবর্তে শনিবার সকালে অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকের পরই ৪, ৫ ও ৬ নভেম্বর টানা ৬০ ঘণ্টা হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করেন মির্জা ফখরুল। কিন্তু যথারীতি এবার হরতালের প্রথম দুই দিনে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মাঠে দেখা যায়নি।

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/last-page/2013/11/06/18767#sthash.BfYQO44B.dpuf