জেলহত্যা দিবসের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী

হরতাল প্রত্যাহারের ওয়াদা করলে আলোচনা

হরতাল প্রত্যাহারের ওয়াদা করলে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হরতাল প্রত্যাহার করুন। আলোচনার পথ খোলা আছে। কিন্তু জাতির কাছে ওয়াদা করতে হবে, আর হরতাল দিয়ে মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না।’
জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে গতকাল রোববার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এ অবস্থানের কথা জানান।
বিরোধীদলীয় নেত্রীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব, হরতাল দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের পড়াশোনার পথ বন্ধ করবেন না। তাদের পরীক্ষার পথ রুদ্ধ করবেন না। যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য যতই হরতাল করেন না কেন, তাদের বাঁচাতে পারবেন না।’
পরীক্ষার সময় হরতাল আহ্বানের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী এটা করতে পারেন। কারণ, তিনি এসএসসি পাস করতে পারেননি। আর ছেলেদের সরকারি টাকা খরচ করে হত্যা, বোমা মারা, হাওয়া ভবন খুলে কমিশন খাওয়ার বিষয়ে পাস করিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, হরতালে ২০টি লাশ পড়েছে। এর দায় বিরোধীদলীয় নেত্রীকে নিতে হবে। ১৪ দলের নেতা-কর্মী ও স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তির উদ্দেশে তিনি বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি আছে। সবাইকে হরতালে জান-মাল রক্ষায় সতর্ক থাকতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, দেশে সময়মতো নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে। তিনি আশা করেন, দেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আবার তাঁদের সেবা করার সুযোগ দেবে। এ সুযোগ পেলে ২০২১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ে স্বাধীনতার সুফল মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে চায় তাঁর দল।

বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁর (খালেদা) কারণেই এক-এগারো হয়েছিল। কিন্তু আর যেন অসাংবিধানিকভাবে কোনো অপশক্তি ক্ষমতায় আসতে না পারে, সে জন্যই বিরোধীদলীয় নেত্রীকে আলোচনায় ডেকেছিলাম। সংসদে ৯০ শতাংশ আসন থাকা সত্ত্বেও সর্বদলীয় সরকার করার ঘোষণা দিয়েছিলাম। কিন্তু বিরোধীদলীয় নেতা তা না মেনে হরতাল দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি বিরোধীদলীয় নেত্রীকে বলি, কোন কোন মিনিস্ট্রি (মন্ত্রণালয়) চান। কোন কোন মন্ত্রণালয় আপনার দরকার। আলোচনা করে ঠিক করি। কিন্তু তিনি আমার কথা শুনলেন না, হরতাল দিলেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৫ আগস্ট আমার ছোট ভাই ও বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। ফোনালাপে বিরোধীদলীয় নেত্রী আমাকে জানিয়েছেন, তিনি ওই দিন জন্মদিন পালন করবেনই, কেক কাটবেনই। এবার বোঝেন তাঁর মানসিকতা। মানসিকতায় বিকৃতি আছে তাঁর। আমি ওনাকে বলব, দেশকে ধ্বংসের পথে নেবেন না।’

ফোনালাপের বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানতাম, উনি দুপুরের দিকে ঘুম থেকে ওঠেন। তাই বেলা একটা থেকে ফোন শুরু করলাম। তিনি ধরলেন না। ফোনটা তো শোয়ার ঘরে ও অফিসে থাকে। বিরোধীদলীয় নেত্রীর লোকজন বললেন, উনি (খালেদা) রাত নয়টায় প্রস্তুত হতে পারবেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি (বিরোধীদলীয় নেত্রী) প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আবারও প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। যার একটি ফোন ধরার প্রস্তুতি নিতে বেলা একটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত সময় লাগে, তিনি দেশ চালাবেন কী করে? জনগণকে এটা বিবেচনা করতে হবে।

বিডিআর বিদ্রোহে বিএনপির নেতা জড়িত—এমন অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিডিআর হত্যার সঙ্গে কারা জড়িত তা সিএনএন অনলাইন রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী ও দলের নেতা, তিনিই টাকাপয়সা দিয়ে ঘটনা ঘটিয়েছেন।’ তিনি বলেন, তাঁর সরকার বিডিআর বিদ্রোহের বিচার করছে। আর যাদের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ তাদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন বিএনপি-জামায়াতের আইনজীবীরা। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিডিআর বিদ্রোহের এক ঘণ্টা আগে বিরোধীদলীয় নেত্রী তাঁর বাসা থেকে বেরিয়ে আত্মগোপনে চলে গেলেন। এত দিন পর পরিষ্কার হয়ে গেল তাঁর (খালেদা) দলের লোক কীভাবে জড়িত ছিল।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘হরতাল প্রত্যাহার করে নিলে আলোচনায় বসব। নতুবা আর কোনো আলোচনা নয়।’

সৈয়দ আশরাফ বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনা দেশের স্বার্থে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে ফোন করেছিলেন। অনেক অশ্লীল কথা বলেছেন, আরও বেশি অশ্লীল বলেছেন তিনি (খালেদা)। আপনারা সামান্য শুনেছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন কথা বলেন, তখন মনে হয় উনি জামায়াতের নেত্রী। তিনি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি চান। নৌকায় ভোট দিয়ে জনগণকে এর জবাব দিতে হবে।’

উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে শান্তির বাণী শুনিয়েছিলেন। বলেছেন, আর সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা হবে না। কিন্তু পাবনার সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা হলো।’

জনসভায় সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। আরও বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

জনসভায় আসা ব্যক্তিরা নিজ নিজ এলাকার মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা ও নৌকার ছবিসংবলিত ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন নিয়ে আসেন। দুপুর গড়াতেই ‘নৌকা’ ‘নৌকা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে পুরো জনসভাস্থল। কেন্দ্রীয় নেতারাও নৌকার স্লোগান ধরেন। অনেকে হাতে তৈরি নানা আকৃতির নৌকা নিয়ে আসেন। এটি কার্যত নির্বাচনী জনসভায় রূপ নেয়।

প্রধানমন্ত্রী জনসভাস্থলে আসেন বিকেল সাড়ে তিনটায়। জনসভায় আসা লোকজন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাড়িয়ে দোয়েল চত্বর, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, শাহবাগ, মৎস্য ভবন এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

এদিকে শহরের রাস্তাজুড়ে মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মী, সমর্থকেরা জনসভায় যাওয়ার কারণে রাজধানীতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। চরম দুর্ভোগে পড়ে লোকজন।