হাসপাতালে আরাম-আয়েশে খুনি

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের প্রিজন সেলে আছেন খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এক আসামি। সহযোগীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করছেন। খাবার আসছে বাইরে থেকে। মুঠোফোনে কথাও বলছেন। ৪১ দিন ধরে তিনি এই হাসপাতালে, কিন্তু একবারও কয়েদির পোশাক পরেননি।এই আসামির নাম রিটু দাশ ওরফে বাবলু। চট্টগ্রামে রেলওয়ের সিআরবি ভবনে গোলাগুলির ঘটনায় হত্যা মামলায় সদ্য মুক্তি পাওয়া যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী ওরফে বাবরের অন্যতম সহযোগী তিনি। নিজেও মহানগর যুবলীগের সদস্য। গত জুন মাসে বাবরের সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালের হত্যা মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত। এত দিন পলাতক থাকায় সাজা কার্যকর হয়নি।গতকাল বুধবার বেলা একটার দিকে হাসপাতালের প্রিজন অ্যানেক্সে গিয়ে দেখা যায়, লুঙ্গি পরে খালি গায়ে ঘোরাঘুরি করছেন রিটু দাশ। কিছুক্ষণ পর খাবারের প্যাকেট নিয়ে আসা দুই যুবক দেখা করতে আসেন। সাংবাদিকের উপস্থিতির কথা জানিয়ে তাঁদের ঢুকতে বাধা দেন দায়িত্বরত দুই কারারক্ষী। কিন্তু যুবকেরা নাছোড়। একজন নিজেকে নগরের গোয়ালপাড়ার রকি পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিনই দেখা করতে আসি। কী হয়েছে আজ?’ বাগিবতণ্ডা শুনে এগিয়ে আসেন এক পুলিশ কনস্টেবল। সেখানে হাজির হন কারারক্ষী আখতার হোসেন।জানতে চাইলে আখতার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারি দলের মানুষ এরা। যতটুক পারি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি।’ কারাবিধি লঙ্ঘন করে রিটুর জন্য বাইরে থেকে খাবারসহ ও মুঠোফোনে কথা বলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কিছু জানি না।’এরপর কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই বেলা সোয়া একটার দিকে আসেন আরও দুই যুবক। তাঁদের হাতে কোমল পানীয়। প্রথমআলোর ফটোসাংবাদিক এ সময় তাঁদের ছবি তুলতে গেলে যুবকেরা ফটোসাংবাদিককে ধাক্কা দিয়ে সরে পড়েন। বন্দী হলেও রিটু দাশ সবার সঙ্গে কথা বলছেন। প্রথম আলোর প্রতিনিধিকে তিনি বলেন, ‘গরমের কারণে কয়েদির পোশাক পরতে পারি না। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তিনটি মামলা হয়েছে। অপহরণের মামলা ও হত্যা মামলায় (সিআরবিতে গোলাগুলি) জামিন পেয়েছি। ৯০ সালের একটি হত্যা মামলায় সাজা ছিল।’ মুঠোফোনে কথা বলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না ভাই, কেউ আমার সঙ্গে দেখাও করেন না।’

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গনির কাছে জানতে চাইলে প্রতিনিধির উপস্থিতিতেই তিনি ফোন করেন চট্টগ্রাম কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক মো. ছগির মিয়াকে। রিটু দাশ অবৈধ সুবিধা নেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেন। পাশাপাশি রিটু দাশের চিকিৎসা তত্ত্বাবধানকারী চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার কাজী সাইফুল আলম আজিমকেও ডেকে পাঠান। রিটু দাশকে চিকিৎসকের পরামর্শমতে হাসপাতালে রাখা না রাখার নির্দেশ দেন তিনি। এ সময় সহকারী রেজিস্ট্রার পরিচালককে বলেন, ‘পরীক্ষা করে দেখে প্রয়োজনে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।’

কারা রেজিস্টার ও মামলার নথি দেখে জানা গেছে, রিটু দাশের বিরুদ্ধে থাকা তিনটি মামলা আছে। এর মধ্যে ১৯৯০ সালে নগরের কোতোয়ালি থানার একটি হত্যা মামলায় রায় হয় ২০০৭ সালের ২০ জুন। এতে তাঁর সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। কিন্তু পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজা কার্যকর হয়নি। তবে একটি অপহরণের অপর মামলায় জামিনে আছেন।

গত ২৪ জুন সিআরবি ভবনে গোলাগুলির মামলায় ২৬ জুন গ্রেপ্তার হন রিটু দাশ। ২৭ জুন তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু কারাগারের সূত্র জানিয়েছে, কারাগারের ভেতরেও তিনি কয়েদির পোশাক পরেননি। শারীরিক অসুস্থতা দেখিয়ে গত ৭ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।

কারাগারের সূত্র জানায়, কারাবিধি অনুসারে সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত যেকোনো বন্দীকেই কয়েদির পোশাক পরতে হবে।

রিটুকে কয়েদির পোশাক না পরানো প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক ছগির মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমন তো হওয়ার কথা নয়। আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, রিটুকে প্রিজন সেলে নিয়ে আসার জন্য মেডিসিন বিভাগের প্রধানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, কেন্দ্রীয় যুবলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য আমিনুল ইসলামের সঙ্গে সখ্য রয়েছে রিটু দাশের। তাঁর প্রভাবের কারণেই তিনি এসব সুবিধা পাচ্ছেন।

জানতে চাইলে যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রিটুর বড় ভাই রতন আমাকে অনুরোধ করায় আমি তাঁকে হাসপাতালে রাখার জন্য ডাক্তারকে বলেছিলাম। সুস্থ হলে অবশ্যই তাঁকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া উচিত।’