মিটফোর্ডে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি

১০৩ ব্যবসায়ীর জেল জরিমানা, ২৮ দোকান সিল, ৮০টি মামলা

পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকার নয়টি মার্কেটে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির অভিযোগে গতকাল শনিবার ২০ ব্যবসায়ীকে এক বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাকি ৮৩ জনকে প্রায় সোয়া কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। গতকাল রাতের মধ্যে জরিমানার টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাঁদের প্রত্যেককে তিন মাস করে কারাভোগ করতে হবে।

এসব ঘটনায় মোট ৮০টি মামলা এবং বিভিন্ন মার্কেটের ২৮টি ওষুধের দোকান ও গুদাম সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। অভিযান চলাকালে ওষুধ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনায় র‌্যাবের একজন সদস্য আহত হন।

র‌্যাব সদস্য আহত হওয়ার পর ওই এলাকায় বিশেষ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রায় দিনভর মিটফোর্ড এলাকা ছিল অস্থিতিশীল। যানজটে প্রায় থমকে যায় ওই এলাকার জীবনযাত্রা। মিটফোর্ডের অধিকাংশ ওষুধের মার্কেটে ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের আটকে রেখে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে র‌্যাবের প্রায় ২০০ সদস্য অংশ নেন, ওষুধ প্রশাসনসহ অন্যান্য সংস্থার সদস্য ছিলেন আরও প্রায় ১০০।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, কয়েক বছরের মধ্যে মিটফোর্ডে ওষুধের মার্কেটে এ ধরনের মারমুখী অভিযান হয়নি। অন্যদিকে র‌্যাব সদস্যরা বলছেন, ব্যবসায়ীরা জোট বেঁধে যেভাবে বাধা দিচ্ছিলেন, তাতে সাঁড়াশি অভিযানের কোনো বিকল্প ছিল না।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত খান ও সর্দার মার্কেটে গেলে ওষুধ ব্যবসায়ীরা প্রথমে বাধা দেন। হাতাহাতির একপর্যায়ে র‌্যাবের সদস্য আমিনুর রহমানের (২৭) মাথা ফেটে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। তাঁকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে র‌্যাবের অতিরিক্ত সদস্যরা অভিযানে যুক্ত হন, গোটা এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় কয়েক দফা ব্যবসায়ীদের বাধার মুখে পড়েন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

র‌্যাব সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ১০টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেনের নেতৃত্বে র‌্যাব মিটফোর্ড এলাকায় ভান্ডারি মার্কেট, খান মার্কেট, আমিন মার্কেট, আমির মার্কেট, আলিফ লাম মীম মার্কেট, নায়লা মার্কেট, নুরপুরী মার্কেট, বিসিবিএস ও আলী মার্কেটে অভিযান চালায়। এতে অংশ নেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক ও র‌্যাব-১০-এর পরিচালক লে. কর্নেল ইমরান ইবনে এ রউফ এবং বিএসটিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

শরীফ মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলা এ অভিযানে প্রচুর পরিমাণে মেয়াদোত্তীর্ণ, ভেজাল, অবৈধ ও নিম্নমানের ওষুধ, নানা রকম সম্পূরক খাদ্য, ব্যথানাশক ওষুধ ছিল। এসব ওষুধ সংরক্ষণ-প্রক্রিয়া ও বিক্রিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০৩ জন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২০ জনকে এক বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরে তাঁদের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, র‌্যাবের সদস্যরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সহযোগিতা পাননি। তা ছাড়া সাদাপোশাকে থাকায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁদের ভুল-বোঝাবুঝি হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতিতে র‌্যাবের একজন সদস্য সামান্য আহত হয়েছেন।

বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সহকারী সাধারণ সম্পাদক মনির হোসেন বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ পরীক্ষাগারে পরীক্ষা ছাড়াই র‌্যাব কোনোভাবেই এটা বলতে পারে না। তিনি আরও বলেন, গতকাল সকালে মিটফোর্ড রোডের কোনো একটি ওষুধের মার্কেটে অভিযান চালাতে গেলে ধস্তাধস্তিতে একজন র‌্যাব সদস্য আহত হন। এর জের ধরে র‌্যাব বিভিন্ন মার্কেটের ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে অবস্থান নেয়। তারা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখে। বিশেষ প্রয়োজনেও কাউকে বের হতে দেয়নি।

মনির হোসেন বলেন, র‌্যাব অমানবিকভাবে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের পিটিয়ে আহত করেছে। সারা বছরে যে পরিমাণ লাভ হয়, একেকজন ব্যবসায়ীকে তার চেয়ে বেশি জরিমানা করা হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে মনির হোসেন জানান, ব্যবসায়ীরা র‌্যাব সদস্যদের অসহযোগিতা করেননি। ব্যবসায়ীরা অভিযানে বাধা দেয়নি কিংবা র‌্যাবের সঙ্গে সংঘর্ষেও লিপ্ত হয়নি। তার পরও যেভাবে জেল-জরিমানা ও মারধরের ঘটনা ঘটেছে, তা অমানবিক। তিনি বলেন, ভেজাল ওষুধ খুঁজতে হলে র‌্যাবকে ভেজাল ওষুধ কারখানায় অভিযান চালানো উচিত।