১৯ জেলা মন্ত্রীবিহীন এক যুগ ধরে

দেশের ১৯টি জেলা থেকে গত এক যুগে কেউ মন্ত্রী হননি। এ বৈষম্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই সরকারের আমলেই। আবার এ দুই দল ক্ষমতায় থাকার সময় অনেক জেলা বঞ্চিত হয় শুধু বিরোধী দলের ‘ভোটব্যাংক’ পরিচিতির কারণে।যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব জেলা থেকে মন্ত্রী হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু এলাকার উন্নয়ন অনেকটাই ব্যক্তিনির্ভর হওয়ায় ‘মন্ত্রীবিহীন’ জেলাগুলো বৈষম্যের শিকার হয়।২০০১-০৬ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার এবং ২০০৯-১৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভা পর্যালোচনা করে ‘মন্ত্রীবিহীন’ ১৯ জেলার নাম জানা গেছে। জেলাগুলো হলো পঞ্চগড়, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জয়পুরহাট, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা, নড়াইল, বাগেরহাট, বরগুনা, পিরোজপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, হবিগঞ্জ, ফেনী, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। অবশ্য পঞ্চগড় থেকে নির্বাচিত সাংসদ জমির উদ্দিন সরকার চারদলীয় জোট সরকারের আমলে স্পিকার ছিলেন।অথচ বর্তমান সরকারের আমলে শুধু ঢাকা জেলা থেকে চারজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। এ ছাড়া দিনাজপুর, লালমনিরহাট, পাবনা, পটুয়াখালী, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, সিলেট, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম থেকে দুজন করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। মন্ত্রিসভায় চারবার রদবদল হলেও এবার ২৮ জেলার কাউকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়নি।প্রায় একই চিত্র ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে। ওই সময় মন্ত্রিসভায় সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্ব ছিল চট্টগ্রামে ছয়জন। এরপর ঢাকা ও টাঙ্গাইলে পাঁচজন। তিনজন ছিলেন কুমিল্লার। ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, চাঁদপুর, নোয়াখালী, নাটোর ও ভোলার দুজন করে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।বর্তমান ক্ষমতাসীন মহাজোটে মন্ত্রিসভার সদস্য ৫৮ (উপদেষ্টাসহ) জন। পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর মধ্যে ৩৪ জেলা থেকে ৪৬ জন সাংসদকে মন্ত্রী করা হয়। অন্য কয়েকজন টেকনোক্র্যাট ও উপদেষ্টা। মন্ত্রিপরিষদে বাকি ৩০টি জেলার কোনো প্রতিনিধি নেই। আর বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ৩৬ জেলা থেকে ৬০ জনকে মন্ত্রী করা হয়। এ আমলে ২৮ জেলা থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়নি।অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিত্ব পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ছয় কোটি নয় লাখ ৪৬ হাজার ৮১৭ জন ভোটারের জন্য কোনো মন্ত্রী ছিলেন না।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন্ত্রিপরিষদে সব জেলার প্রতিনিধি থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যে জেলা থেকে মন্ত্রী হচ্ছেন, সে জেলার উন্নয়ন অন্য জেলার চেয়ে বেশি হচ্ছে।এ ধরনের বৈষম্য সুশাসনের জন্য অন্তরায় কি না, জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারবিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো, উন্নয়ন কাজগুলো হয় ব্যক্তিগত ও সীমানা পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নে মন্ত্রীরা বড় ভূমিকা রাখেন। যে এলাকায় মন্ত্রী নেই, সেই এলাকায় সমতার ভিত্তিতে উন্নয়ন হয় না। তোফায়েল আহমেদের মতে, ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন করতে একটি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।দেখা গেছে, মন্ত্রিসভায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের আধিপত্য ছিল বরাবর। পার্বত্য চট্টগ্রামের মধ্যে রাঙামাটি সুনজর পেলেও আড়ালে থেকে গেছে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি। উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু জেলা ও উপকূলীয় অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া কোনো কোনো জেলা বছরের পর বছর মন্ত্রিপরিষদে প্রতিনিধিত্বহীন থেকেছে। এ ছাড়া বিএনপি বা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে যেসব জেলার পরিচিতি আছে, সেসব এলাকা থেকে মন্ত্রী নির্বাচনে সতর্ক থাকতে দেখা গেছে দেশের দুটি বড় দলকেই। বৃহত্তর রাজশাহীতে মহাজোট সরকারের প্রথম চার বছর কোনো মন্ত্রী ছিল না, যদিও গত বছর শিল্প প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান রাজশাহীর ওমর ফারুক চৌধুরী। একইভাবে আওয়ামী লীগ-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, শেরপুর ও শরীয়তপুর থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়নি চারদলীয় জোট সরকারের আমলে।

সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতির কারণে বরিশাল বিভাগের প্রভাবশালী নেতারা মহাজোটের মন্ত্রিপরিষদে স্থান পাননি। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার মধ্যে শুধু পটুয়াখালী থেকেই দুজন প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন। তবে বিএনপির আমলে বরিশাল বিভাগ থেকে ছয়জনকে মন্ত্রী করা হয়েছিল।

মন্ত্রিপরিষদে জায়গা না পাওয়ায় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না—জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, ‘আমাদের দেশে দেখা যায়, যিনি মন্ত্রী হন তাঁর নির্বাচনী এলাকায় রাস্তাঘাট বেশি হয়। আমার জানামতে, এবার যুবকল্যাণ ও খেলার বরাদ্দ সবচেয়ে বেশি পেয়েছে গোপালগঞ্জ ও সিলেট।’

অপরদিকে দেখা গেছে, দুই সরকারের আমলেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে থেকেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের চাবি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে আছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, জনপ্রশাসন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, নারী ও শিশুবিষয়ক এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়। একইভাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হাতে ছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, প্রতিরক্ষা, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

আধিপত্যের ধরন: বর্তমান মহাজোট সরকারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী আছেন ৫১ জন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগ থেকেই মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ১৮ জন। বর্তমান মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী দুজনই ঢাকা বিভাগের।

মহাজোট সরকার নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা বিভাগের ৯৭টি আসনের সবগুলো পায়। কিন্তু ঢাকা ও গোপালগঞ্জ থেকে ছয়জন মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন। মাদারীপুর থেকে শাজাহান খান ও আবুল হোসেনকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া হলেও পাশের জেলা শরীয়তপুর ছিল প্রতিনিধিত্বহীন।

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে ঢাকা ও টাঙ্গাইল থেকে পাঁচজন করে মোট ২২ জনকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বিভাগে ওই সময় ৯০টি আসনের মধ্যে চারদলীয় জোট পেয়েছিল ৫৬টি আসন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি ও স্থানীয় সরকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিল একই বিভাগের।

চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দাপট দুই দলের মন্ত্রিসভাতেই ছিল ও আছে। মহাজোট সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলা থেকে মন্ত্রী করা হয়েছে আটজনকে। চাঁদপুর জেলার দুই মন্ত্রী পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদে রাঙামাটি জায়গা পেলেও উপেক্ষিত থেকেছে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি।

চারদলীয় জোট সরকারের ৬০ জনের মন্ত্রিসভায় চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে ১৮ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি থেকে কাউকে মন্ত্রী করা হয়নি।

মহাজোট সরকারের আমলে সিলেট বিভাগের চার জেলা থেকে মন্ত্রী করা হয় তিনজনকে। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী সিলেটের। আর দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সুনামগঞ্জের। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেট বিভাগের সিলেট ও মৌলভীবাজার থেকে দুজনকে মন্ত্রী করা হয়। দেখা গেছে, বরিশাল বিভাগ আওয়ামী লীগের শাসনামলে সবচেয়ে পিছিয়ে ছিল। তবে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা থেকে বরিশালের দুজনসহ ছয়জনকে মন্ত্রী করা হয়েছিল।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশের তৃণমূল নেতৃত্বের কোনো ক্ষমতা নেই। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। কেন্দ্র থেকে সবকিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদে তৃণমূলের প্রতিনিধি থাকল কি থাকল না, সেটা দেখা হয় না।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ অবশ্য বলেছেন, যে এলাকায় মন্ত্রী নেই, সে এলাকায় স্থানীয় সরকার বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে। কারণ, যেসব এলাকায় মন্ত্রী আছে, সেখানে তাঁর লোকজন স্থানীয় সরকারকে নানা কাজে চাপ প্রয়োগ করে। তবে তিনি এ-ও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী যখন যে এলাকার হন, তখন সেই এলাকার উন্নয়ন বেশি হয়।