২৫ অক্টোবরের পর কী হবে?…আলী রীয়াজ

‘রোজ কেয়ামত হলেও নির্বাচন হবে’ বলে আওয়ামী লীগের সভাপতি-মণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্যের সঙ্গে আক্ষরিকভাবে একমত হওয়ার অবকাশ নেই। তবে তাঁর এ বক্তব্যের মর্মবস্তু বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না; সরকারি দল বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো রকম আপসের কথা বিবেচনা করবে না, যেভাবেই হোক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সরকারি দলের নেতারা, বিশেষত প্রধানমন্ত্রী সংকল্পবদ্ধ। অন্যদিকে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া বলেছেন যে তাঁরা নির্বাচন প্রতিহত করবেন। এসব বক্তব্যের পাশাপাশি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি, ২৫ অক্টোবরের পর সরকারের কাজ দৈনন্দিন দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মনেই প্রশ্ন, ২৫ অক্টোবরের পর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে?
কিছুদিন ধরে সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট, নির্বাচনে বিরোধীদের অংশগ্রহণ করা না-করার বিষয়টি এখন আর সরকারি দলের ধর্তব্যের বিষয় নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট করে একাধিকবার বলেছেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউইয়র্কে তিনি নির্বাচন বিষয়ে যেসব কথা বলেছেন, তা-ও আগের চেয়ে ভিন্ন নয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং কমনওয়েলথের মহাসচিব কমলেশ শর্মার সঙ্গে আলাদা আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এর বাইরে কিছু বলেছেন বলে জানা যায়নি। বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির পাঠানো চিঠির পর সরকার নতুন বা সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, এমনকি প্রধানমন্ত্রী এর কোনো প্রত্যুত্তর দেননি। তা থেকেও বলা যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রীর নতুন কিছু বলার ছিল না। প্রধানমন্ত্রী যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে এতটাই নিশ্চিত যে তা পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসংঘের নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এই আমন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে এলেই যথোপযুক্ত বলে ধারণা করতে পারি। কিন্তু এই আমন্ত্রণ আনুষ্ঠানিক এবং সরকারি। সরকারপ্রধান বোঝাতে চেয়েছেন
যে বিদেশিরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করলেও তাঁর কোনো আপত্তি নেই। এসব কারণে এ বিষয়ে বোধ হয় কারোরই আর অস্পষ্টতা নেই যে সরকারি দলের পক্ষ থেকে যা বলার বলা হয়ে গেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনের দাবির বিষয়ে বিএনপির সুর আগের চেয়ে নরম; অন্তত ইদানীংকালে। তারা দাবি থেকে সরে আসেনি, কিন্তু সম্ভবত বিএনপির নেতারা জানেন যে এখন তাঁদের দাবি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। আগের চেয়ে আরও কম। আগস্ট মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের মহাসচিবের টেলিফোনের পর আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় এ বিষয়ে একটা সমাধান পাওয়া যাবে বলে বিএনপি এবং অন্যরা যে আশা করেছিল, তারা নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে অনুধাবন করতে পেরেছে যে তার সম্ভাবনাও এখন ক্ষীণ। বিএনপির প্রতিনিধিদের নিউইয়র্কে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তাঁদের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর যে উৎসাহ ছিল না, তা অজানা নয়। সর্বশেষ এক জনসভায় খালেদা জিয়া তাঁর ভাষণে বলেছেন, ‘হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাব না, যাব না। শুধু যাব না নয়, তাঁদের অধীনে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন প্রতিহত করা হবে।’
সেপ্টেম্বরের গোড়ায় বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকারের যে তিনটি সম্ভাব্য মডেল বিবেচনা করেছিল, তার কোনোটাতেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতায় রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা ছিল না। তা থেকে বোঝা যায় যে অন্য যেকোনো বিকল্পের বিষয়ে তারা খানিকটা হলেও নমনীয় হতে রাজি আছে, কিন্তু এ বিষয়ে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট যে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে তারা নির্বাচনে যাবে না। বিএনপি এখন সংবিধান সংশোধনের জন্য ২৫ অক্টোবর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে; সহজ ভাষায় এ সংসদের সরকারের প্রতিশ্রুত শেষ অধিবেশন পর্যন্ত বিএনপি অপেক্ষা করবে। সেটার কারণ তাদের উদারতা নয়, গত কয়েক বছরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করতে না পারা। কিন্তু সরকারের মনোভাবে নাটকীয় পরিবর্তন না ঘটলে গতকাল এবং ২৫ অক্টোবরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে আর কোনো রকম অগ্রগতির আশা করারও কোনো কারণ নেই।
কিন্তু ২৫ অক্টোবরের পর কী হবে, সেটাই এখন অনেকের প্রশ্ন। সাংবিধানিকভাবে বিবেচনা করলে ২৫ অক্টোবরের পর দেশের শাসন পরিচালনায় পরিবর্তনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংবিধানের ১২৩(৩) ধারা নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে—হয় তা হবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ৯০ দিনের মধ্যে, নতুবা সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরের ৯০ দিনের মধ্যে। সংবিধানের কোথাও লেখা নেই, নির্বাচনকালে সরকারের আকার কী হবে, তার দায়িত্ব কী হবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সঙ্গেও সংসদ থাকা না-থাকার বিষয় জড়িত নয়, ৫৭(৩) অনুযায়ী পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী শপথ না নেওয়া পর্যন্ত তিনি বহাল থাকবেন। মন্ত্রীদের মেয়াদ বিষয়ে ৫৮(৩) বলেছে, সংসদ ভেঙে গেলেও তাঁদের দায়িত্ব পালনে কোনো বাধা নেই; আর যখন সংসদ বহাল আছে, তখন তাঁদের ক্ষমতা হ্রাসের কোনো বিধান নেই, থাকতে পারে কি না, তা-ও প্রশ্ন সাপেক্ষ।
প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, নির্বাচন-পূর্ব ৯০ দিনের শুরু হয়ে গেলে সরকার কেবল দৈনন্দিন কার্যকলাপ চালাবে, এর বেশি কিছু নয়। ২ সেপ্টেম্বর সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী কেবল এ কথাই বলেননি যে সংসদ তার মেয়াদ পূর্ণ করবে; তিনি এ-ও বলেছেন যে সংসদ ও মন্ত্রিসভা দুই-ই বহাল থাকবে। তাঁর এই বক্তব্য সংসদে গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত, কিন্তু এখন এ নিয়ে বাক্যবিস্তার নিরর্থক। শেষ বিচারে এ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর, ২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে এ বিষয়ে ভিন্নমতের কোনো উপায় নেই। সেটা যতটা না সংবিধানের বিধিবিধানের কারণে, তার চেয়ে বেশি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে। এ ধরনের পরিস্থিতি হলে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ভিন্ন কথা বলতেন না, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে পঞ্চম সংসদের ভাগ্যও এভাবেই নির্ধারিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর এযাবৎ দেওয়া বক্তব্য ছাড়া কি কোনো বিধান রয়েছে, যার কারণে এ ধারণা তৈরি হচ্ছে যে ২৫ অক্টোবরের পর নাটকীয় ধরনের পরিবর্তন ঘটবে? প্রধানমন্ত্রী চাইলে এ মন্ত্রিসভা অপরিবর্তিত থাকবে, চাইলে তার আকার ছোট হবে, চাইলে বড় হবে। কিন্তু তা কোনো অবস্থাতেই সংবিধান দিয়ে নির্ধারিত নয়। মন্ত্রিসভার আকার-আকৃতি যেমন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানির্ভর, তেমনি তাঁর উপদেষ্টাদেরও পদত্যাগের কোনো রকম বাধ্যবাধকতা নেই।
রাজনৈতিক সরকার, মন্ত্রিসভা এবং অন্যান্য কাঠামো যদি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তবে প্রশাসনের দায়িত্ব বর্তায় জনপ্রশাসনের হাতে। কিন্তু আসন্ন এই অবস্থায় তাঁদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কি কোনো দিকনির্দেশনা তাঁদের দেওয়া হয়েছে? সাধারণ মানুষের কাছেও কি এ বিষয়ে কোনো রকম ধারণা রয়েছে? ২৫ অক্টোবরের পর দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তার মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে প্রশাসন কী ধরনের ব্যবস্থা নেবে, তা যেমন আমরা জানি না, ঠিক তেমনি প্রশাসনের নেওয়া ব্যবস্থা যে রাজনৈতিক বিবেচনা-প্রসূত বলে বিবেচিত হবে না, তার নিশ্চয়তা পাওয়ার কোনো উপায় নেই।
এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা একেবারে অমলূক নয়। ২৫ অক্টোবরের আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া কোনো রায় কার্যকর করার সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় রাখলে এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা থেকেই যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে তা ২৫ তারিখেই অবসান হবে না।
এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়, সেসব রায়ের আপিলের রায়ের ব্যাপারেও বিএনপি একধরনের নীরবতা পালন করেছে; কিন্তু ভবিষ্যতে সেই নীরবতা পালনের সুযোগ না থাকলে দলটি কী ভূমিকা নেবে এবং নির্বাচনের ওপরে তার কী প্রভাব ফেলবে, সেটা সরকারি দল বিবেচনায় নিয়েছে কি না, সেটা তারাই বলতে পারবে। বিএনপির দুজন নেতা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন।
ট্রাইব্যুনাল এরই মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। এ ব্যাপারে বিএনপি কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ অক্টোবরের পরও বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকাই স্বাভাবিক। এসব বিষয়ে পত্রপত্রিকায় আলোচনা না হওয়ার অর্থ এই নয় যে এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ-আশঙ্কা নেই। তার সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিএনপির স্পষ্ট ঘোষণা যে তারা নির্বাচন প্রতিহত করবে। নির্বাচন প্রতিহত করা নিয়ে বিএনপির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেও অনেক প্রশ্ন ওঠে। সেসব বিষয় পরের কিস্তিতে।
আলী রীয়াজ: পাবলিক পলিসি স্কলার, উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র।