৩২ মাসে কাজ মাত্র ৩২ ভাগ!

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম ব্যুরো
২০১০ সালের ডিসেম্বরে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়া হয়েছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের। দুই দফায় সময় বাড়ানোর পর ২০১৪ সালেই শেষ হতে যাচ্ছে এ প্রকল্পের মেয়াদ। এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে ৩২ মাস। অথচ এ সময়ে প্রকল্পের কাজ এগিয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ! এ হিসাবে পরবর্তী ১৬ মাসে কাজ শেষ করতে হবে ৬৮ শতাংশ। তাই বাকি সময়ে প্রকল্পের এত কাজ শেষ করা যাবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। খোদ প্রকল্প ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও এমন সংশয় প্রকাশ করেন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত। এ সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে মহাজোটের
নির্বাচনী ইশতেহারেও। ক্ষমতায় আসার পর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পটিকে বাস্তবায়নের উদ্যোগও নেয় মহাজোট সরকার। নানা জটিলতা শেষে স্বপ্নের এ চার লেন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও সুফল ঘরে তুলতে পারছে না বর্তমান সরকার। সর্বশেষ যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের মহাসড়কের ৭৩ কিলোমিটার চার লেনের কাজ দৃশ্যমান করার জন্য ঘোষণা দেন। মার্চের মধ্যেই এ কাজটি দৃশ্যমান হবে বলে ঘোষণা দিয়ে তা বাস্তবে পরিণত করতে বেশ তোড়জোড়ও চালান তিনি; কিন্তু মার্চের পর আগস্ট পেরোলেও সে ঘোষণার বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকল্পে ধীরগতি কারণে সরকারের বাকি মেয়াদেও ৭৩ কিলোমিটার সড়ক দৃশ্যমান করা যাবে কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে চার লেনের কাজ যতই পিছিয়ে যাচ্ছে ততই দীর্ঘায়িত হচ্ছে মানুষের ভোগান্তি। মহাসড়কের কোনো না কোনো অংশে প্রতিদিন কম-বেশি যানজট লেগেই থাকছে। ছয় ঘণ্টায় মধ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পেঁৗছানোর কথা থাকলেও এখন লেগে যাচ্ছে ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দিনে বিভিন্ন ধরনের কম-বেশি ১৯ হাজার গাড়ি চলাচল করে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দির মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ১৯২ কিলোমিটার পর্যন্ত সড়ককে ১০টি প্যাকেজে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে চার লেন প্রকল্প। এর মধ্যে সাতটি প্যাকেজের আওতায় চার লেনের কাজ করছে চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো, দুই ভাগের কাজ করছে রেজা কনস্ট্রাকশন এবং এক ভাগ কাজ করছে তাহের ব্রাদার্স লিমিটেড। সব মিলিয়ে মোট কাজের ৭০ শতাংশ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান ও ৩০ শতাংশ করছে দেশীয় দুই প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত তিনটি কারণে নির্ধারিত মেয়াদে শেষ করা যাচ্ছে না ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেনের কাজ। এর প্রধান কারণই হচ্ছে_ সময়মতো ঠিকাদারদের প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিতে না পারা। বর্ষা মৌসুমে কাজ করতে না পারা, ভরাটের জন্য মাটির অভাব এবং সড়ক-সংলগ্ন বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে সৃষ্ট জটিলতা। এ ছাড়া ঠিকাদারদের কাজে ধীরগতি ও ঘন ঘন হরতালসহ আরও বেশ কয়েকটি কারণে চার লেনের কাজ আশানুরূপভাবে এগোচ্ছে না। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ পিছিয়ে যাওয়ার কারণে বাড়ছে প্রকল্প ব্যয়ও। দুই হাজার ৩৮২ কোটি টাকা বাজেট ধরে কাজ শুরু হলেও পরে বাড়তে বাড়তে প্রকল্প ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে তিন হাজার ১৯০ কোটি টাকায়।
প্রকল্পের ধীরগতির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী স্বপন কুমার নাথ সমকালকে বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ এবং ধর্মীয়, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে গিয়ে অনেক সময় লেগে গেছে। তার পরও চার লেনের কাজ অনেক এগিয়েছে। অনেক স্থানে এখন কার্পেটিংয়ের কাজও শুরু হয়েছে। তা ছাড়া বেশি সময় লাগে এমন বেশির ভাগ কাজই এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। ফলে চার লেনের অগ্রগতি এখন খুব দ্রুতই চোখে পড়বে।
খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, মহাসড়কের অনেক স্থানে এখনও মাটি ভরাটের কাজই শুরু করা যায়নি। মাটি সংকট ও ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতায় মাটি ভরাট কাজ থমকে যাচ্ছে। মহাসড়কের চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড় দারোগারহাট থেকে ধুমঘাট ব্রিজ পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে চার লেন করতে এখনও ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার ভরাটই করা যায়নি। জটিলতার কারণে মিরসরাইয়ের কালিবাড়ী থেকে সুফিয়া রোড পর্যন্ত দুই কিলোমিটারে কোনো মাটিই ফেলা যায়নি। মিরসরাইয়ের ঠাকুরদীঘি থেকে মাস্তাননগর পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার সড়ক দৃশ্যমান করার কাজ চলছে। তবে এরই মধ্যে বাড়ইয়েরহাট থেকে মাস্তাননগর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে।
জানা গেছে, চার লেন প্রকল্পের আওতায় ২৩টি সেতু, ২৩২টি কালভার্ট, তিনটি রেলওয়ে ওভারপাস, ১৪টি বাইপাস সড়ক, তিনটি ফুটওভার ব্রিজ, দুটি আন্ডারপাস ৬১টি বাসস্টপ করা হচ্ছে।
১০ প্যাকেজের যে অংশে যত কাজ হয়েছে :কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সোয়া দুই বছরে চার লেনের কাজ হয় মাত্র ২৮ শতাংশ। আর গত ছয় মাসে কাজ এগিয়েছে মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ। সম্প্রতি প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কাজের অগ্রগতি-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে আগস্ট পর্যন্ত প্রকল্পের মাঠ পর্যায়ের কাজ ৩২ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তুলনামূলক বেশি অগ্রগতি হয়েছে প্যাকেজ-৭-এর আওতাধীন মহাসড়কের ধুমঘাট ব্রিজ থেকে মিরসরাই বাজার পর্যন্ত। এখানে শেষ হয়েছে মোট কাজের ৬০ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম অগ্রগতি হয়েছে প্যাকেজ-২-এর আওতাধীন কুমিল্লা কুটুমবকুর থেকে কুমিল্লা বাইপাস পর্যন্ত এলাকায়। এখানে কাজ হয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ! এ ছাড়া প্যাকেজ-১-এর আওতায় কুমিল্লা দাউদকান্দি থেকে কুটুমবকুর পর্যন্ত ৪৫ শতাংশ, প্যাকেজ-২-এর আওতায় কুমিল্লা কুটুমবকুর থেকে কুমিল্লা বাইপাস পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, প্যাকেজ-৩-এর আওতায় কুমিল্লা বাইপাস থেকে বাইপাসের শেষ পর্যন্ত ২২ শতাংশ, প্যাকেজ-৪-এর আওতায় কুমিল্লা বাইপাসের শেষ থেকে বাতিশাবাজার পর্যন্ত ২৪ শতাংশ, প্যাকেজ-৫-এর আওতায় বাতিশাবাজার থেকে মহিপাল পর্যন্ত ১৮ শতাংশ, প্যাকেজ-৬-এর আওতায় মহিপাল থেকে ধুমঘাট ব্রিজ পর্যন্ত ২৭ শতাংশ, প্যাকেজ-৭-এর আওতায় ধুমঘাট ব্রিজ থেকে মিরসরাই বাজার পর্যন্ত ৬০ শতাংশ, প্যাকেজ-৮-এর আওতায় চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে পঞ্চশীলা বাজার পর্যন্ত ২৬ শতাংশ, প্যাকেজ-৯-এর আওতায় পঞ্চশীলা থেকে কুমিরা বাইপাস পর্যন্ত ৩৭ শতাংশ এবং প্যাকেজ-১০-এর আওতায় কুমিরা বাইপাস থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত ৪৮ শতাংশ কাজ হয়েছে।