৩ হাজার কোটি টাকার বেতার তরঙ্গ মাত্র ২১৫ কোটিতে!

রাশেদ মেহেদী/জয়দেব দাশ
থ্রিজি নিলাম নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির মধ্যে ওয়াইম্যাক্স বরাদ্দে টেলিকম খাতের বড় একটি অনিয়ম ঘটানোর সব আয়োজন চূড়ান্ত করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি। পাঁচ বছর আগের তরঙ্গমূল্যে (২১৫ কোটি টাকা) নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে ওয়াইম্যাক্স প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। পাঁচ বছর আগে নিলামের সূত্র ধরে অভিনব কৌশলে এই বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ‘ওলো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন সমকালকে বলেন, ওলোর স্পেকট্রাম অনুমোদন দেওয়ার আগে অবশ্যই বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখা হবে; বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের মতামত যাচাই করা হবে। তিনি বলেন, অনিয়ম হয় এমন কোনো কিছুই তার সময়ে হয়নি, হবেও না।
মন্ত্রী বলেন, তার দায়িত্বের মেয়াদে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নিজ নিজ ক্ষমতায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছেন তিনি। যেখানে মন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন, কেবল সেসব ফাইলই আসছে। ওলোর স্পেকট্রাম অনুমোদন দেওয়ার আগে স্পেকট্রাম বিভাগের মতামত এবং মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা হবে, যেন কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওলোকে বেতার তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাবটি এখন মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি বোস সমকালকে বলেন, ওলোর স্পেকট্রাম আবেদন ‘টেকনোলজি নিউট্রোলিটি’র
নিরিখে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিষয়টি এখন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে।
বর্তমানে থ্রিজি সেবা দেওয়ার জন্য যে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হবে, তার মূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। ওয়াইম্যাক্সের জন্য বরাদ্দ করা স্পেকট্রাম সমপর্যায়ের হওয়ায় বর্তমানে এর মূল্যও একই পরিমাণ হবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সে তরঙ্গই গাইডলাইন সংশোধন করে তিন হাজার কোটি টাকার স্থলে ২১৫ কোটি টাকায় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রোববার রাজধানীতে এক সেমিনারে বিটিআরসির চেয়ারম্যান বলেন, বিদ্যমান ওয়াইম্যাক্স অপারেটররা লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না করায় ওয়াইম্যাক্স সেবায় মনোপলি ভাঙতেই নতুন করে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দিতে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু বিটিআরসির ১৫৮তম কমিশন সভার আলোচ্যসূচিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ইন্টার এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের (বিআইইএল) জন্য ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের আবেদন পুনর্বিবেচনা-সংক্রান্ত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত’। ওই বৈঠকের আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ থেকে স্পষ্ট হয়, ওলোকে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দেওয়ার স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন সংশোধন করা হচ্ছে।
বিটিআরসি-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাঁচ বছর আগে ওয়াইম্যাক্স নিলাম থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে অংশগ্রহণকারী দেখিয়ে ওলোকে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দেওয়ার জন্য গাইডলাইন সংশোধনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বিটিআরসির কমিশন সভায়। বিটিআরসি সূত্র জানায়, স্পেকট্রাম বিভাগ থেকে এ ব্যাপারে মতামত চাওয়া হলে বিভাগ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সব দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গাইডলাইন পরিবর্তন ছাড়া ওলোকে আবেদনকৃত স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয় বলে মত দেয়। পরে কমিশন সভায় ওলোর স্বার্থে গাইডলাইন সংশোধনের ব্যাপারে প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
বিটিআরসির ১৫৪তম কমিশন বৈঠকে বিআইইএলের জন্য ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৬ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২০ মেগাহার্টজ করে দুটি স্লটে তরঙ্গ বরাদ্দ দিয়ে ব্রডব্যান্ড ওয়ারলেস অ্যাকসিস (বিডবি্লউএ) লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছে। সর্বশেষ গত ১৯ আগস্ট কমিশনের ১৫৮তম সভায় আরও দুটি শর্ত যোগ করে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। শর্ত দুটি হচ্ছে, সরকার ওয়াইম্যাক্স গাইডলাইনের কোনো শর্ত সংশোধনযোগ্য মনে করলে ২০০১ সালের টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৪(গ) ধারা অনুযায়ী তা সংশোধন করতে পারবে। এ ছাড়া সরকার ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নতুন করে ফি আরোপের শর্ত গাইডলাইনে সংযোজন করতে পারবে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্সের নিলামে অংশ নেয় নয়টি প্রতিষ্ঠান। ওই সময় প্রাথমিকভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দেওয়া হয়। নয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাংলালায়ন কমিউনিকেশন লিমিটেড ২১৫ কোটি টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে থাকে ব্র্যাক বিডিমেইল নেটওয়ার্ক লিমিটেড ও অগরে ওয়ারলেস ব্রডব্যান্ড বাংলাদেশ লিমিটেড। এদের মধ্যে ব্র্র্যাক লাইসেন্স নিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এরপর চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম অবস্থানে থাকা প্রতিষ্ঠানকে বিটিআরসি থেকে চিঠি দিয়ে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়। এদের মধ্যে চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে ভিটেল বাংলা, বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ লিমিটেড ও পি-১ কনসোর্টিয়াম লাইসেন্স নিতে কোনো প্রকার আগ্রহ না দেখানোয় সপ্তম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ম্যাংগো টেলি সার্ভিস লিমিটেডকে বিডবি্লউএ লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। তবে নিলামের ২১৫ কোটি টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে তখন ম্যাংগো কিছু সুবিধা দাবি করে বিটিআরসির কাছে। বিটিআরসি ম্যাংগোকে প্রাথমিকভাবে সুবিধা দিলেও নানা কারণে পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। আদালতে বিষয়টি এখনও নিষ্পত্তি না হলেও নতুন করে ওয়াইম্যাক্স লাইসেন্স দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ লিমিটেড নামে প্রতিষ্ঠানটিকে। এ প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ান প্রতিষ্ঠান মাল্টিনেটের সঙ্গে যৌথভাবে ‘ওলো সার্ভিস’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। মাল্টিনেট বিআইইএল এবং নিউ জেনারেশন গ্রাফিকস লিমিটেড (এনজিজিএল) নামে দুটি আইএসপি (ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডর) প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দকৃত তরঙ্গ সমন্বয় করে আরও প্রায় দেড় বছর আগে থেকে কৌশলে গ্রাহক পর্যায়ে ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট সেবা চালু করেছে। বিটিআরসিতে তাদের এ সেবা নিয়ে নিলামের মাধ্যমে লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করা দুটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আপত্তি উঠলেও বিটিআরসি তা আমলে নেয়নি; বরং ওলো দাপটের সঙ্গে ব্যবসা করছে এবং তাদের ইন্টারনেট সেবার মান বৈধ দুটি ওয়াইম্যাক্স অপারেটরের চেয়ে ভালো। ফলে রাজধানীতে ওলোর গ্রাহক চাহিদাও বাড়ছে। লাইসেন্স ও তরঙ্গ বরাদ্দ না নিয়েই শত শত কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করলেও নিলামে অংশ নিয়ে লাইসেন্স পাওয়া ওয়াইম্যাক্স কোম্পানির মতো ওলোকে লভ্যাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারেও জমা দিতে হচ্ছে না। বৈধ ওয়াইম্যাক্স সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলালায়ন ও কিউবি সরকারকে বছরে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। এর সঙ্গে রয়েছে বার্ষিক লাইসেন্স ফি তিন কোটি টাকা ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যেহেতু থ্রিজির জন্য বরাদ্দ করা স্পেকট্রাম দিয়ে ফোরজি এলটিই প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টি উন্মুক্ত করা হয়েছে, সেহেতু ওয়াইম্যাক্সের স্পেকট্রামের ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি উন্মুক্ত হবে।