চট্টগ্রাম মেয়রের তিন বছর

৫৬ প্রতিশ্রুতি, একটি পূরণ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন উন্নয়নে ৫৬ দফা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন এম মন্জুর আলম। প্রধান তিন প্রতিশ্রুতি জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা ও যানজট নিরসনে প্রথম তিন বছরে কোনো সফলতা দেখাতে পারেননি মেয়র। নাগরিকেরা মনে করেন, সেবার মানের আরও অবনতি হয়েছে।চট্টগ্রাম উন্নয়ন আন্দোলনের প্রার্থী হিসেবে মন্জুর আলম ২০১০ সালে ১৭ জুন মেয়র নির্বাচিত হন। ৫৬ দফার মধ্যে ১৫-২০টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করলেও আংশিক শেষ হয়েছে কয়েকটি। এগুলো হলো মসজিদ, মন্দিরসহ অন্য সব ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কার ও উন্নয়নে পদক্ষেপ, কর প্রদান-প্রক্রিয়া সহজীকরণ, মশার উপদ্রব কমানো, বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের মাটি ভরাটকাজ শেষ এবং সৌন্দর্যবর্ধনে বিভিন্ন এলাকায় নানা ভাস্কর্য, ফোয়ারা স্থাপন ইত্যাদি। কেবল নগরের স্টেশন রোডে ছিন্নমূল ভাসমান মানুষদের জন্য ভবন নির্মাণকাজ পুরোপরি শেষ হয়েছে। এটি ছিল স্বল্পমেয়াদি প্রতিশ্রুতির একটি।ছয় মাস থেকে এক বছরে স্বল্প মেয়াদে এবং আড়াই বছরের মধ্যে মধ্য মেয়াদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল উল্লেখ করে নগর বিশেষজ্ঞ ও স্থপতি জেরিনা হোসেন বলেন, অধিকাংশ কাজ এখনো শেষ হয়নি। এত প্রতিশ্রুতির বিষয়টি যেন কৌতুকে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, ৫৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে গত তিন বছরে কেবল ছিন্নমূলদের জন্য ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এ বিষয়ে সিটি মেয়র মন্জুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়টি এখনো যোগ-বিয়োগ করে দেখিনি। তবে বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছি। এ জন্য নগরবাসীর সহযোগিতা ও করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আরও আন্তরিকতা প্রয়োজন।’

মন্জুর আলমের নির্বাচনী ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, স্বল্প মেয়াদের ১৭ দফার মধ্যে প্রথমেই ছিল জলাবদ্ধতা সমস্যাকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা। কিন্তু তিন বছরেও নগরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পায়নি। ভারী বর্ষণ হলে নগরজুড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

তবে মেয়রের দাবি, বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে জলাবদ্ধতা এখন সহনীয় পর্যায়ে আনা হয়েছে। তিনি বলেন, নগরের জলাবদ্ধতার মূল কারণ মাস্টার ড্রেনেজ পরিকল্পনা-১৯৯৫ বাস্তবায়িত না হওয়া। এখন আর জলাবদ্ধতা হয় না, যা হয় তাকে বড়জোর জলজট বলা যেতে পারে। তবে এ সমস্যা পূর্ণাঙ্গভাবে নিরসনে সরকারকেও আন্তরিক হতে হবে।

গত তিন বছরে জলাবদ্ধতা নিরসনে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি। করপোরেশনের তিন বছরের বাজেট বক্তৃতা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন খাল-নালা-নর্দমা থেকে মাটি উত্তোলনে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে।

একসময় পরিচ্ছন্ন নগর হিসেবে সারা দেশে ‘মডেল’ ছিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। নগরবাসীর অভিযোগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পুরো নগর এখন আবর্জনার শহরে পরিণত হয়েছে। অথচ নির্মল ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি ছিল প্রতিশ্রুতির তালিকায় তিন নম্বরে।

নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী আলী আশরাফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিচ্ছন্নতাসহ নগরবাসীর বিভিন্ন মৌলিক সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে কিছুই করতে পারেননি মেয়র। এসব সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি। বরং নগরের পরিচ্ছন্নতা আগে যে অবস্থায় ছিল, তার অবনতি হয়েছে।’ তবে মশক নিধন ও বিলবোর্ড উচ্ছেদে মেয়রের ভূমিকা প্রশংসা করেন তিনি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরের রিয়াজউদ্দিন বাজার, নিউমার্কেট, জামালখান, ষোলশহর, মুরাদপুর, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ময়লা-আবর্জনার কারণে চলাফেরা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জামালখান এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত পরিষ্কার না করায় দুর্গন্ধে চলাফেরা করা দায়।

এ প্রসঙ্গে করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আলী আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নগর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন প্রায় তিন হাজার কর্মী। বর্তমানে আমাদের আছে মাত্র এক হাজার ৬০০। তাই জনবল সংকটের কারণে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’

স্বল্প মেয়াদের অন্য প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে ছিল নগরের অধিবাসীদের যাতায়াত ও চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাস্তা নির্মাণ ও উড়াল সেতু তৈরি, কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত বিভিন্ন খালের মুখে স্লুইস গেট নির্মাণ, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির সংকটের মতো সমস্যাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, নগর পরিবহনসেবা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ, যুবসমাজের জন্য উন্নতমানের ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। এগুলো বাস্তবায়নে কাজই শুরু হয়নি।

তবে রাস্তা নির্মাণ ও হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদান সহজ করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মেয়র। এ ছাড়া নগরের মহেশ খালে স্লুইচ গেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ফোরাম ফর প্ল্যান চিটাগাংয়ের নির্বাহী সদস্য প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, মেয়র নগরের উন্নয়নে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বদলে নিয়মিত কাজের প্রতি বেশি জোর দিয়েছেন। ফলে সময় যতই যাচ্ছে নগরের সংকটগুলো ঘনীভূত হচ্ছে। এ ছাড়া যানজট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।

মধ্যমেয়াদি প্রকল্প: মধ্য মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য ১০ দফা প্রতিশ্রুতি ছিল। এগুলোর মধ্যে বাকলিয়ায় স্টেডিয়ামের জন্য মাটি ভরাট, ঠান্ডাছড়িতে একটি বৃদ্ধাশ্রম ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। এ ছাড়া বন্ধ মিল-কারখানা চালুর উদ্যোগ, বৈকালিক ও নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন, গণগ্রন্থাগারের ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, মাদকাসক্ত যুব ও তরুণ সমাজের সুচিকিৎসার জন্য একাধিক আধুনিক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন এবং সদরঘাট থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর পাড় ঘেঁষে ১০ কিলোমিটারের অধিক দীর্ঘ স্থানে ৪০ ফুট প্রশস্ত সকাল ও বিকেলের বিনোদন ভ্রমণের জন্য ফুটপাত নির্মাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে এগুলোর এখনো কাজ শুরু হয়নি।

দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প: এই মেয়াদের উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা বৃদ্ধীকরণ ও দুটি সেতু নির্মাণ, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ, নিম্নবিত্তদের জন্য আত্মকর্ম সংস্থান, সমবায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, সিটি থিয়েটার ও সংগীত প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন, আইটি ভিলেজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। এগুলোর কোনোটাই শুরু হয়নি।

দীর্ঘমেয়াদি নেওয়া ২৯ দফা প্রকল্পের অনেকগুলোই অবাস্তব ও অপূরণীয় বলে মন্তব্য করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আলী আশরাফ। তিনি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে তহবিল সংগ্রহ করার এখতিয়ার করপোরেশনের নেই। মেয়র বরং সরকারকে সহযোগিতা করতে পারেন।