৮ আসামিকে বাঁচিয়ে দুদকের তদন্ত রিপোর্ট

এজাহারে নাম থাকার পরও নানা চাপের কারণে সোনালী ব্যাংকের আটজন কর্মকর্তাকে বাদ দিয়েই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এজাহারে ২৭ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের মধ্যে আটজনকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং নতুন ছয়জনকে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সব মিলে সোনালী ব্যাংক ও হলমার্কের ২৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের সুপারিশ করা হলো এবং চলতি সপ্তাহেই এটি অনুমোদন দিতে পারে দুদক। এদিকে এজাহারভুক্ত আসামি নন সোনালী ব্যাংকের এমন ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছে তদন্তদল।
গতকাল রবিবার দুপুরে দুদকের তদন্তদলের তৈরি করা প্রতিবেদন কমিশনে জমা হয়। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ ১১টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন কমিশনের চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের কাছে দাখিল করেন। সোনালী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পরিষদের একাধিক পরিচালকের বিরুদ্ধে হলমার্ক গ্রুপকে ঋণ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ থাকলেও দুদকের মামলা পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে পরিষদের কোনো পরিচালকই অভিযুক্ত হননি।
তদন্ত টিমের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হলমার্ক গ্রুপের এই ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের কয়েকজন পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করার কথা ছিল। কারণ ভুয়া কাগজপত্রে বিশাল অঙ্কের ওই ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকজন পরিচালক জড়িত ছিলেন এবং মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছিলেন। কয়েকজন আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তাঁদের অনেকের নামও প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু নানামুখী চাপের কারণেই তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
অপর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হলমার্ক বলেন আর বিসমিল্লাহ গ্রুপই বলেন, কোনো মামলাতেই সরকারি দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আসামি হবে না। এখন পর্যন্ত আলোচিত যতগুলো মামলার অনুসন্ধান কিংবা তদন্ত হয়েছে, সব অভিযোগ থেকেই নানামুখী চাপে পড়ে দুদক বাধ্য হয়েছে তাঁদের বাদ দিতে।
যাঁরা অব্যাহতি পাচ্ছেন : তদন্ত প্রতিবেদনে এজাহারভুক্ত আট আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছেন সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের সাবেক ডিজিএম ও বর্তমানে সিলেটের জিএম কার্যালয়ে কর্মরত জিএম ভগবতী মজুমদার, একই বিভাগের এজিএম মো. আবুল হাসান এবং রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা (অব.) মো. ওয়াহিদুজ্জামান। এ তালিকার বাকি পাঁচজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তাঁরা হলেন সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের জিএম আ ন ম মাসরুরুল সিরাজী ও সবিতা সিরাজ, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম মো. খুরশিদ আলম ও আশরাফ আলী পাটোয়ারী। তাঁরা কোনো দুর্নীতিতে যুক্ত ছিলেন না বলে উল্লেখ করে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘দায়িত্বে অবহেলার জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
যাঁরা চার্জশিটভুক্ত হচ্ছেন : তদন্ত দল ২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিলের সুপারিশ চেয়েছে কমিশনের কাছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হলমার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. তানভীর মাহমুদ, তাঁর স্ত্রী ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (জিএম) তুষার আহমেদ, হলমার্ক গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাপারেল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. শহিদুল ইসলাম, স্টার স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, টিঅ্যান্ড ব্রাদার্সের পরিচালক তসলিম হাসান, ম্যাক্স স্পিনিং মিলসের মালিক মীর জাকারিয়া, সেঞ্চুরি ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. জিয়াউর রহমান, আনোয়ারা স্পিনিং মিলসের মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম, প্যারাগন গ্রুপের এমডি সাইফুল ইসলাম রাজা, নকশী নিটের এমডি মো. আবদুল মালেক ও সাভারের হেমায়েতপুরের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জামাল উদ্দিন সরকার।
তদন্ত প্রতিবেদনে সোনালী ব্যাংক শেরাটন বা রূপসী বাংলা হোটেল শাখার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) এ কে এম আজিজুর রহমান, সহকারী উপমহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. সাইফুল হাসান, নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল মতিন ও সোনালী ব্যাংক ধানমণ্ডি শাখার বর্তমান জ্যেষ্ঠ নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেরুন্নেসা মেরিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারির সময় মেরি ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখায় কাজ করতেন।
এ ছাড়া ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় জিএম অফিসের দুই মহাব্যবস্থপক (জিএম) ননী গোপাল নাথ ও মীর মহিদুর রহমান (দুজনই ওএসডি), প্রধান কার্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হুমায়ুন কবির, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাইনুল হক ও আতিকুর রহমান (দুজনই ওএসডি), দুই উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) শেখ আলতাফ হোসেন (সাময়িক বরখাস্ত) ও মো. সফিজউদ্দিন আহমেদ (সাময়িক বরখাস্ত), দুই এজিএম মো. কামরুল হোসেন খান (সাময়িক বরখাস্ত) ও এজাজ আহম্মেদকে তদন্তে অভিযুক্ত করা হয়।
এদিকে আসামি নন- এমন ১০ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করেছে তদন্ত টিম। তাঁরা হলেন সোনালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (অর্থায়ন) বিভাগের এজিএম মো. শওকত আলী, ভিজিল্যান্স অ্যান্ড কন্ট্রোল বিভাগের ডিজিএম এম এইচ এস আবু জাফর, বেসিক ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি কাজী ফখরুল ইসলাম, জিএম মো. মাহবুবুল হক ও নওশের আলী খন্দকার, অডিট অ্যান্ড ইনস্পেকশন ডিভিশন-২-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. একরামুল হক মণ্ডল। এ ছাড়া রয়েছেন ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া ইনস্পেকশন অ্যান্ড অডিট ডিভিশন-২-এর শাহিদা খানম, পরিদর্শন ও নিরীক্ষা বিভাগের এজিএম শামিম আখতার এবং রূপসী বাংলা শাখার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম ও উকিল উদ্দিন।
২০১২ সালের ৪ অক্টোবর হলমার্ক গ্রুপের এমডি, চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে ১১টি মামলা করে দুদক। মামলায় অভিযোগ করা হয়, সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে রূপসী বাংলা হোটেল শাখা থেকে হলমার্ক মোট দুই হাজার ৬৮৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে। এর মধ্যে স্বীকৃত বিলের বিপরীতে পরিশোধিত (ফান্ডেড) অর্থ হচ্ছে এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ৩৪ হাজার ৮৭৭ টাকা। দুদকের সিনিয়র উপপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ টিম এ মামলার তদন্ত করে।